জেফরি এপস্টিনের মডেলিং চক্র: ব্রাজিলীয় কিশোরীদের শোষণের গল্প
বিবিসি নিউজ ব্রাজিলের একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে যুক্ত ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনাল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তরুণী ও কিশোরীদের সংগ্রহ করতেন। এই চক্রে ব্রাজিলের গ্রাম থেকে আসা গ্লসিয়া ফেকেত ও আনা (ছদ্মনাম) সহ অনেকেই শিকার হয়েছিলেন।
গ্লসিয়ার অভিজ্ঞতা: মায়ের সতর্কতা বাঁচাল জীবন
২০০৪ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্লসিয়া ফেকেত ব্রাজিলের গ্রাম থেকে মডেলিং জগতে প্রবেশের সুযোগ পান। ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনাল তাঁর বাড়িতে এসে গ্লসিয়ার মা বারবারাকে রাজি করান, যাতে গ্লসিয়া ইকুয়েডরে একটি মডেলিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। গ্লসিয়া বলেন, ‘আমি যদি মায়ের কথা অমান্য করে নিউইয়র্ক চলে যেতাম, তবে আমার কী হতো?’ এই প্রশ্ন এখনও তাঁকে তাড়া করে।
প্রতিযোগিতা শেষে, ব্রুনাল গ্লসিয়াকে নিউইয়র্কে ফ্যাশন শোতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বারবারা সন্দিহান হয়ে সরাসরি না বলে দেন। তিনি বলেন, ‘ওরা শুধু শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের খুঁজছিল। দুর্ভাগ্যবশত ওরা আমার মেয়েকেও খুঁজে পেয়েছিল।’ মায়ের এই সতর্কতাই গ্লসিয়াকে রক্ষা করে।
আনার কাহিনি: ভিসার কারসাজি ও শোষণ
আনা (ছদ্মনাম) নামের আরেক ব্রাজিলীয় নারী জানান, ব্রুনালের মডেলিং ব্যবসাই তাঁকে এপস্টিনের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম ছিল। ২০০০ সালের শুরুর দিকে, তাঁকে মডেলিংয়ের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে সাও পাওলোতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাঁর কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে দেহব্যবসায় নামানো হয়। আনা বলেন, ‘ওই নারী ছিলেন একজন দালাল। আমি কিছু বোঝার আগেই তিনি আমাকে দেহব্যবসায় নামিয়ে দেন।’
ব্রুনাল আনার জন্য একটি মার্কিন বিজনেস ভিসার ব্যবস্থা করেন, যেখানে স্পনসর হিসেবে তাঁর এজেন্সি ‘কারিন মডেলস অব আমেরিকা’র নাম ছিল। আনা জানান, এই ভিসা শুধু এপস্টিনের কাছে যাতায়াতের মাধ্যম ছিল। তিনি এপস্টিনের সঙ্গে প্রায় চার মাস যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে কাটান, এমনকি এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপেও যান।
ব্রুনালের ভূমিকা ও তদন্ত
বিবিসির অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে, ব্রুনাল তাঁর সঙ্গে যুক্ত মডেলিং এজেন্সিগুলো ব্যবহার করে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তরুণীদের এপস্টিনের কাছে পাঠাতেন এবং মার্কিন ভিসার ব্যবস্থা করতেন। মার্কিন নথিপত্রে দেখা গেছে, ইকুয়েডরের প্রতিযোগিতা চলাকালে এপস্টিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং অন্তত একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মডেল তাঁর ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াত করেছিলেন।
বর্তমানে, ব্রাজিলের ফেডারেল পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস (এমপিই) তদন্ত করছে যে ব্রাজিলে এপস্টিনের সঙ্গে যুক্ত কোনো বড় পাচারকারী চক্র কাজ করছিল কি না। শ্রম পরিদর্শক মাউরিসিও ক্রেপস্কি জানান, এই ঘটনাগুলো মানবপাচার হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পার হলেও জড়িতদের শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকে।
বর্তমান অবস্থা: স্বাভাবিক জীবনে ফেরা
গ্লসিয়া ও আনা—দুজনেই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তাঁরা মনে করেন, সেই ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফেরাটা তাঁদের বড় সৌভাগ্য। গ্লসিয়া বলেন, ‘সেদিন আমার মা আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।’ এই গল্পগুলি এপস্টিন ও ব্রুনালের চক্রের নৃশংসতা এবং আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের জটিলতা উন্মোচন করে।
