৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় গ্রেপ্তার তাসনীম আফরোজ ও মামুনের মুক্তি চেয়েছেন ১৪৫ বিশিষ্ট নাগরিক
৭ মার্চের ভাষণে গ্রেপ্তার তাসনীম আফরোজ-মামুনের মুক্তি চান ১৪৫ নাগরিক

৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় গ্রেপ্তার তাসনীম আফরোজ ও মামুনের মুক্তি চেয়েছেন ১৪৫ বিশিষ্ট নাগরিক

ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুনের নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছেন ১৪৫ বিশিষ্ট নাগরিক। একই সঙ্গে তারা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের জরুরি সংস্কারেরও দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় রয়েছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, আজফার হোসেন, কামরুল হাসান মামুন, মোশাহিদা সুলতানা, ফিরোজ আহমেদ, সাহেদ আলম, বাকী বিল্লাহ, অরূপ রাহী, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মনিরুল ইসলাম, রায়হান রাইন, জিএইচ হাবীব, আফসানা বেগম, আরিফুজ্জামান তুহিন, খালেদ হোসাইন, নূরুল আলম আতিক, এ টি এম গোলাম কিবরিয়া, আরিফ রহমান, রিয়াজ খান, নাহিদ হাসান এবং ধ্রুব সাদিক প্রমুখ সমাজের নানা ক্ষেত্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ।

ঘটনার বিবরণ ও গ্রেপ্তারের পটভূমি

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭ মার্চ রাতে শাহবাগ থানার সামনে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর অভিযোগে একদল ‘মব সন্ত্রাসী’ শেখ তাসনিম আফরোজকে মারধরের পর পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পুলিশ তাকে আটক রাখে এবং পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায়। আদালত এই মামলায় জামিন নামঞ্জুর করে। এছাড়া ৮ মার্চ দিবাগত রাত তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেলকেও একই ধরনের মব সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে।

নির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকার ও বাস্তবতার পার্থক্য

বিবৃতিতে নির্বাচিত সরকার অঙ্গীকার করার পরেও ‘মব’ সন্ত্রাসের ঘটনা অব্যাহত থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকার যাত্রা শুরুর পরপরই মব সন্ত্রাস নির্মূলের প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও বাস্তবে দেখা গেছে, দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত এবং ইউনেসকো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য ৭ মার্চের ভাষণের ঘটনাকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মিলিয়ে একদল সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই মব করেছে। শাহবাগ থানার পুলিশের সামনেই তাসনীম আফরোজ ও আবদুল্লাহ আল মামুনকে মব করে পিটিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা বা মব সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করতে দেখা যায়নি। বরং ইমি ও মামুনকেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংজ্ঞা ও প্রশ্ন

৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা কীভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হতে পারে, সেই মৌলিক প্রশ্ন রেখে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯–এ মূলত সন্ত্রাসী কার্যক্রম, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যকলাপ প্রতিরোধের কথা বলা ছিল। পরে ২০১২ ও ২০১৩ সালে সংশোধনী এনে সাইবার মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যক্রম মোকাবিলার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা সন্ত্রাসী কার্যক্রম? সরকার বা পুলিশই কি তবে ঠিক করে দেবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম কোনটা? হাসিনার শাসন খারাপ হলে এসব আইন ভালো হয় কেমনে?’

তাসনীম আফরোজ ও আল মামুনের ভূমিকা

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাসনীম আফরোজ নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, বরং তিনি বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিচিত মুখ। তিনি শিক্ষার্থীদের অধিকার, নারীদের অধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তৎকালীন ছাত্রলীগ কর্তৃক বারবার শারীরিক ও মানসিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এমনকি হাসিনা সরকারের ডিবি পুলিশ তাঁকে হল থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, আবদুল্লাহ আল মামুন গণ–অভ্যুত্থানের সময় জুলাইয়ের ১৮ তারিখে ফেসবুকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে জুলাইয়ের ৩০ তারিখ তাঁর প্রোফাইল রক্তিম করেছেন, যা তাঁর ফেসবুকে এখনো বিদ্যমান।

মুক্তি ও আইন সংস্কারের দাবি

অবিলম্বে তাসনীম আফরোজ ও আবদুল্লাহ আল মামুনের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘হাসিনার আমলের সন্ত্রাস দমন আইনটিকে জবাবদিহিমূলক ও সংস্কার করা এবং মবের নামে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বারবার সংগঠিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে।’ এই দাবিগুলো নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।