প্রথম আলোর পোড়া ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী, দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
প্রথম আলোর পোড়া ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী, ক্ষোভের ঢেউ

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনে 'আলো' শিল্প প্রদর্শনী, দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ

উগ্রবাদীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলোর কার্যালয় ভবনে চলছে শিল্প প্রদর্শনী 'আলো'। গতকাল বুধবার সকালে এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে এসে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, 'সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে লাইভে দেখেছি। হতভম্ব হয়েছি, ক্ষুব্ধ হয়েছি, হতাশ হয়েছি। সেই রাতের ঘটনা কত ভয়াবহ ছিল, আজ না দেখলে বুঝতাম না। এটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, জাতি হিসেবে আমাদের মাথাটা হেঁট হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ তো আমাদের জাতির বিবেকের ওপরই আক্রমণ।'

হামলার স্মৃতিতে প্রদর্শনী, দর্শকদের প্রতিক্রিয়া

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। বিশিষ্ট শিল্পী মাহবুবুর রহমানের শিল্প প্রদর্শনী 'আলো' শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিদিন বিদেশি কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা আসছেন প্রদর্শনী দেখতে। গতকাল প্রচুর দর্শক সমাগম হয়েছে, যারা শিল্পকর্মের প্রশংসার পাশাপাশি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী বলেন, 'এটা জাতির জন্য লজ্জা যে একটা গণমাধ্যমের ওপর আমাদের নিজের দেশের মানুষ এমন হামলা করেছে। আশা করব, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি না হয়। এই ধ্বংসাত্মক কাজ আমরা কখনোই সমর্থন করি না।'

বিভিন্ন পেশার মানুষের বক্তব্য

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, 'একটা কথাই মনে হয়েছে, আমাদের এখানে বর্বরতার উত্থান হয়েছে। আমরা হয়তো বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছি না। কিন্তু যখন তাদের এমন ভয়াবহ তাণ্ডবের দৃশ্যের সামনে দাঁড়াই, তখন বর্বরতার ভয়াবহতা বুঝতে পারি।'

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি বেদনার চিহ্ন হয়ে থাকবে। তিনি সব মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের দৃঢ় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানান।

জার্মানির বার্লিনে কর্মরত সফটওয়্যার প্রকৌশলী নায়লা তাজনিন আশরাফি বলেন, প্রদর্শনীতে এসে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা তাঁর কাছে 'লোমহর্ষক' বলে মনে হয়েছে। দেশের এমন নাশকতার খবর প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে বড় আঘাত দেয় এবং বিদেশে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে।

প্রদর্শনীর সময়সূচি ও স্থায়িত্ব

প্রদর্শনীটি প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আবদুল মালেক শিকদার ও তাঁর স্ত্রী নীলুফার নিঘাত বলেন, 'ধ্বংসের ভয়াবহতা দেখে আমরা স্তম্ভিত। প্রদর্শনীটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।'

কক্সবাজার থেকে আসা ব্যবসায়ী তৌফিকুল শাকিল বলেন, 'এই ভবনের সঙ্গে আমারও কিছু স্মৃতি আছে। অনেকবার এখানে প্রথমার বিক্রয়কেন্দ্র থেকে বই কিনেছি। পবিত্র কোরআন, হাদিসসহ ধর্মীয় বইও ছিল অনেক। সেগুলোও পোড়ানো হয়েছে। এই নৃশংসতার জন্য খুব খারাপ লেগেছে।'

শিল্পী ও শিল্পসমালোচক অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, 'শিল্পের শক্তির একটা বহিঃপ্রকাশ এই প্রদর্শনী। ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনা ফেলে দেওয়ার জিনিস। কিন্তু সেটা যে রূপান্তরিত হয়ে শিল্পে পরিণত হতে পারে, এই প্রদর্শনীতে তা আমরা ভালোভাবে জানলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে এমন ঘটনা আর ঘটবে না।'

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, 'দুঃসহ স্মৃতির ওই রাতটিকে আরেকবার দেখলাম।' প্রদর্শনীটি হামলার স্মৃতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরছে, যা দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।