প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা: লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের বর্ণনা
১৮ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে একদল উগ্রবাদীর হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে একই রাতে ডেইলি স্টার ভবনেও অনুরূপ হামলা চালানো হয়। ফটোসাংবাদিকের চোখে সেই ভয়াবহ রাতের বর্ণনা তুলে ধরা হলো।
হামলার শুরু: স্লোগান থেকে সহিংসতা
রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করে। ফটোসাংবাদিক বিভাগের প্রধান জাহিদুল করিমের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এক ফটোসাংবাদিক। তিনি দেখতে পান ৫০-৬০ জন লোক কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর সিএ ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। শাহবাগ থেকে আরেকটি মিছিল প্রথম আলো অফিসের দিকে আসার খবর শুনে আতঙ্কিত হন তিনি।
রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে কয়েক শ মানুষের একটি মিছিল কারওয়ান বাজার মেট্রোস্টেশনের নিচে এসে থামে। সেখানে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন ‘প্রথম আলো এই দিকে’ স্লোগান দিতেই সবাই আইল্যান্ডের গ্রিল টপকে প্রথম আলো ভবনের দিকে ছুটে আসে। তারপর তারা একযোগে হামলা চালায় প্রথম আলো ভবনে। তেজগাঁও থানার ওসিসহ পুলিশের ৫-৬ জন সদস্য ঘটনাস্থলে ছিলেন, কিন্তু ওসি একাই মব সৃষ্টিকারীদের থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
হামলাকারীরা ভবনের শাটার ভাঙতে লাফিয়ে লাফিয়ে লাথি মারতে থাকে এবং ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। শাটার ভাঙতে দেরি হওয়ায় তারা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ঢিল ছুড়ে গ্লাস ভাঙে। অনেক চেষ্টার পর শাটার একটু ফাঁক করে হামলাকারীরা দলে দলে ভবনের ভেতরে ঢোকে। ভবনে ঢুকেই তারা ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করে দেয়।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে চেয়ার, সোফা, টেবিল, বই–পুস্তক ও নথিপত্র নিচে ছুড়ে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দ্রুতই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাস্তায়। হামলাকারীরা লুট করা টিভি, মনিটর, সিপিইউ, ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার সময় ফটোসাংবাদিক ছবি তুলতে গেলে একজন হামলাকারী কুড়াল হাতে বাধা দেয়।
ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা
রাত সাড়ে ১২টার পর হামলাকারীদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় ডেইলি স্টার–এর দিকে। ফটোসাংবাদিক তাদের পিছু পিছু যান। রাস্তায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনড় দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু কিছুই করেন না। সেনাসদস্যদের চোখের সামনে দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে ডেইলি স্টার–এর দিকে এগিয়ে যায় হামলাকারীরা।
ডেইলি স্টার ভবনে পৌঁছে তারা লুটপাট ও ভাঙচুর শুরু করে এবং ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফটোসাংবাদিক ৪০ মিনিটের মতো ছবি তুলে সেনাবাহিনীকে এ বর্বরতা থামাতে অনুরোধ করলেও তারা নীরব দাঁড়িয়ে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করলে তারা জানায়, পুলিশ তাদের যদি আসতে বলে, তবেই তারা আসবে।
অগ্নিনির্বাপণে বাধা ও চূড়ান্ত ধ্বংস
প্রথম আলো ভবনের সামনে ফিরে এসে ফটোসাংবাদিক দেখেন, ইতিমধ্যে ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। পুলিশকে অনেক জোর করার পর ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করতে দেখা যায়। সেনাবাহিনীও চলে আসে এবং সবাইকে সরে যাওয়ার জন্য হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দেয়, কিন্তু হামলাকারীরা সে কথা শুনতে নারাজ।
প্রথম আলো ভবনের বেশির ভাগ পুড়ে অঙ্গার হওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন শোনা যায়। হামলাকারীরা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে গাড়ি ফিরিয়ে দেয়। অবশেষে রাত ২টা ৩০ মিনিটে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে এসে আগুন নেভানোর কার্যক্রম শুরু হয়। তবে রাত ৪টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে ফটোসাংবাদিক দেখেন, আগুন নিভছে না।
পরবর্তী অবস্থা ও মর্মান্তিক অনুভূতি
ভবনটি আবার আগের মতো কর্মব্যস্ত হবে কিনা, লুট হয়ে যাওয়া মালামাল উদ্ধার হবে কিনা—এমন নানা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ফটোসাংবাদিক বাসায় ফিরে যান। বাসায় গিয়ে চোখে ঘুম না আসায় সকাল হতে না হতেই আবার ছুটে আসেন অফিসে। তখনো পোড়া ভবন থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছিল এবং ভবনের সামনে আগুনের তাপ অনুভূত হচ্ছিল।
এই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। হামলাকারীরা গণমাধ্যমের ওপর এই আক্রমণকে মধ্যযুগীয় কায়দায় চারপাশ থেকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
