স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা: দায়িত্ববোধের অভাব কেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: দায়িত্ববোধের অভাব কেন বাধা?

স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: ইতিহাসের গভীরে এক অনিবার্য টান

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি জাতিরই এক অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা হইল স্বাধীনতা অর্জন। প্রতিটি সচেতন জনপদই স্বাধীনতা চাহিয়াছে—নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, আত্মমর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতের উপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, বহু ভূখণ্ড কাগজে কলমে স্বাধীন বটে, তাহার পরও ‘কিন্তু’ থাকিয়া যায়। উপমহাদেশের একটি জনপদের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, সেইখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বারবার জাগ্রত হইয়াছে; কিন্তু পূর্ণতা পায় নাই। বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটিয়াছে, ক্ষমতার রূপান্তর ঘটিয়াছে, নূতন নূতন আশা জন্ম লইয়াছে— তবু স্বাধীনতার গভীর অনুভূতি অধরাই রহিয়াছে।

দায়িত্ববোধের প্রশ্ন: স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি

কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। স্বাধীনতা মানে আত্মশাসন। আর আত্মশাসন মানে দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষমতা। যেই সমাজ দায়িত্বকে ভয় পায় বা দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে ব্যর্থ হয়, সেইখানে স্বাধীনতা প্রায়শই স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে। এই জনপদের মানুষ শত শত বৎসর ধরিয়া পরাধীন ছিল। কেন স্বাধীন হইতে পারে নাই? তাহার কারণ হইল, স্বাধীন হইতে হইলে দায়িত্বশীল হইতে হয়। বাঙালিরা দায়িত্বশীল জাতি হিসাবে গড়িয়া উঠে নাই। এই জনপদের মানুষ হইল কথার রাজা। গলাবাজি, বিতর্ক, বড় বড় কথা—এই সকলের মধ্যে তাহারা নিজেদের শক্তি খুঁজিয়া পায়। আর তাহাদের কথার সহিত কর্মের ব্যবধান বিশাল। এই জন্য বহু বৎসর পূর্বে কবি জীবনানন্দ দাশের মাতা বলিয়াছিলেন—‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।' দুঃখের বিষয় হইল, এই পক্তি যেন সময়ের সীমানা অতিক্রম করিয়া আজও এক অস্বস্তিকর আয়না ধরিয়া রাখে—যেইখানে দেখা যায়, কথায় আমরা তুবড়ি ছুটাই, কিন্তু দায়িত্বে পিছাইয়া পড়ি।

বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা: অদৃশ্য শক্তির প্রভাব

তবে কেবল অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দিয়াই ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা দেখায়, কিছু অঞ্চল সকল সময় বৃহত্তর শক্তির অদৃশ্য টানাপড়েনের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। এই শক্তিগুলি কখনো সরাসরি উপস্থিত থাকে না—কিন্তু অর্থনীতি, কূটনীতি কিংবা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। এই কারণে ইতিহাসের আরেকটি নির্মম অধ্যায় রহিয়াছে। তাহা হইল—পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে যাহারা প্রকৃত স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, তাহাদের প্রায়শই করুণ পরিণতি ঘটিয়াছে। এমনকি কখনো দেখা যায়, বহু বৎসর পরে হইলেও সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের স্মৃতি বা আশ্রয়স্থল পর্যন্ত ধ্বংস করা হইয়াছে। বিশ্ব ইতিহাসে ইহার বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর বহু স্মারক ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছিল প্রতিশোধের ভাষায়। কিছু অঞ্চলে প্রাচীন ঐতিহ্য ধ্বংস করা হইয়াছে ক্ষমতার নূতন বয়ান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। এই সকল ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়— স্থাপনা ভাঙা কখনো শুধু স্থাপত্যের বিরুদ্ধে আঘাত নহে, ইহা একটি ধারণার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ।

স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব: একমুখী আকাঙ্ক্ষা নয়

ইহার আরো একটি কারণ হইল—একটি জনপদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বহু ক্ষেত্রেই একমুখী থাকে না। একদিকে থাকে মুক্তির স্বপ্ন, অন্যদিকে থাকে সেই স্বপ্নের বিরোধিতা—যাহারা স্বাধীনতার ধারণাকেই প্রশ্ন করিয়াছে। সময়ের স্রোতে একসময় তাহারা সেই প্রতীকগুলিকেই লক্ষ্য করিয়াছে। বস্তুত, যদি একটি সমাজ নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় এবং ইহার পাশাপাশি বহিরাগত শক্তির অদৃশ্য প্রভাবের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তাহা হইলে স্বাধীনতা একটি অর্ধসমাপ্ত প্রকল্প হইয়া দাঁড়ায়। তখন স্বাধীনতা থাকে; কিন্তু সার্বভৌমত্বের গভীরতা অনুপস্থিত থাকে। একটি জনপদের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের উপর—দায়িত্বশীল নাগরিক চেতনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং ইতিহাসের প্রতি সম্মান। এই তিনটির মধ্যে যে কোনো একটি দুর্বল হইলে স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ইতিহাস বারবার দেখাইয়াছে, স্বাধীনতার স্বপ্ন যত মূল্যবান, তাহার পথ তত বিপজ্জনক। যাহারা সেই পথ ধরিয়া হাঁটেন, তাহাদের পরিণতি বহু ক্ষেত্রেই নির্মম হয়। ইহাই কিছু জনপদের ট্র্যাজেডি।