নেত্রকোনার মদনে মাত্র ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে বারবার ধর্ষণ করে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা করার অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরের বিরুদ্ধে। মামলা হওয়ার পরও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্টো অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও প্রকাশ করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন অভিযুক্ত এই শিক্ষক।
ঘটনার বিবরণ
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আমান উল্লাহ সাগর চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি নানার বাড়িতে থেকে সেখানে পড়াশোনা করত। গত বছরের ২ নভেম্বর মাদ্রাসা ছুটির পর শিক্ষক তাকে মসজিদে ঝাড়ু দিতে ডেকে নিয়ে যান এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। পরে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অসুস্থতা ও চিকিৎসা
সম্প্রতি শিশুটির শরীরে অসুস্থতা ও পরিবর্তন দেখা দিলে মা বিষয়টি আঁচ করেন। গত ১৮ এপ্রিল মদন উপজেলার একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার উদ্যোগে জেলা সদর হাসপাতালেও মেডিকেল পরীক্ষা করানো হলে বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার শিশুটির মা বাদী হয়ে শিক্ষককে আসামি করে থানায় ধর্ষণ মামলা করেন।
গাইনি চিকিৎসক সায়মা আক্তার বলেন, 'শিশুটি মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে। জানায়, তার পেট ভার ভার লাগে। কী যেন হঠাৎ করে নড়াচড়া করে। পরে পরীক্ষা করে দেখতে পাই, বাচ্চাটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটিকে যখন বারবার জিজ্ঞাসা করি, "মা, তোমাকে এ কাজ কে করেছে?" তখন তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। শুধু বলে, "হুজুর, হুজুর এই কাজ করেছে।"'
চিকিৎসক জানান, শিশুটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। তার সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ শিশুর মাথার মাপ অনেক বেশি হওয়ায় বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২, যা স্বাভাবিক প্রসবকে মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেসিয়ার ডোজ নির্ধারণও চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের বক্তব্য
শিশুটির মা বলেন, 'আমাকে আমার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে লইয়া খুব কষ্ট করি। জীবিকার তাগিদে সিলেটে মানুষের বাসায় কাম করি। মেয়েডারে আমার বাপের বাড়িতে রাইখ্যা কষ্ট কইরা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাতে দিছিলাম। কিন্তু হুজুর আমার এই বাচ্চাটার সঙ্গে এমন পিশাচের মতো কাজ করতে পারল, আমি স্বপ্নেও ভাবিছিলাম না। এই ঘটনায় আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।'
অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য
এদিকে পলাতক অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, 'মেয়েটি একসময় আমার মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে, তবে ঘটনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হোক, আমিও সেটাই চাই।'
তবে নির্দোষ হলে পালিয়ে থাকার কারণ কী—এ প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুলিশের অবস্থান
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম জানান, আসামিকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। একাধিক জায়গায় অভিযান চালিয়েও তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।



