গণমাধ্যম দিবসে ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিক নিপীড়নের ইতিহাস
গণমাধ্যম দিবসে ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিক নিপীড়ন

অন্তর্বর্তী নোবেল শাসকের বিদায়ের পর নির্বাচিত সরকারের আমলে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস। নানা আলোচনা হবে, লেখালেখি হবে, সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়ে কথা বলবেন সুশীল সম্পাদকরা। কিন্তু তারা বলবেন না যে, তাদের আইয়ামে নোবেলিয়েতের আমলেই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম পার করেছে আইয়ামে জাহেলিয়াত।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ফিরেছে ১৭ বছর পর এবং মাত্র তিন মাস চলছে। তাই আজকের আলোচনায় স্বভাবতই এই সময়টা বিবেচিত হবে না। হবে ২০২৪ এর শেষ ভাগ, ২০২৫ সাল পুরোটা এবং ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত— যার পুরো সময়টায় বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূস ও তার সুশীল উপদেষ্টাদের অধীনে।

সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময়

তাদের পুরো সময়টা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো দেড়টি বছর মাত্র, কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে রক্ত, ভাঙা শরীর, ভাঙা কলম এবং ভাঙা কণ্ঠ। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, ভাঙা সাহস। রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র সমর্থিত উচ্ছৃঙ্খল বাহিনীর চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ, মামলা ও গ্রেফতারের ভয়— সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা পেশাকে এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযাত্রায় পরিণত করে গেছে ইউনূস সরকার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিসংখ্যানে সাংবাদিক নিপীড়ন

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে আছে কোনও না কোনও প্রতিবেদকের আহত শরীর, কোনও পরিবারে আতঙ্ক, কোনও সংবাদকক্ষে স্তব্ধতা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, প্রকাশিত সংবাদের জেরে মামলা, প্রাণনাশের হুমকি— এমনকি হত্যাকাণ্ড, সবই ছিল সাংবাদিকতার ‘নিয়মিত ঝুঁকি’।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা আরও ভয়াবহ। ২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক হত্যা, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। একজন নিহত হয়েছেন— একজন মানুষের জীবন, একটি কণ্ঠ, একটি কলম চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ২৯৫ জন আহত হয়েছেন, ১৬৩ জন লাঞ্ছিত বা হুমকির শিকার হয়েছেন, ১৭০ জন পড়েছেন আইনি হয়রানির ফাঁদে। ৪৬টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন। এই সংখ্যা দেখলে প্রশ্ন জাগে— এটি কি সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র, নাকি কোনও ভয়ভিত্তিক শাসনের প্রতিচ্ছবি?

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার হিসাব আলাদা হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে তারা একমত— সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতির দিকে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? সম্প্রতি প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। গতবছর যেখানে এই অবস্থান ছিল ১৪৯। সংস্থাটির এই সূচক অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মানচিত্রে আরও অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। এই পরিসংখ্যান কোনও বিচ্ছিন্ন সমালোচনা নয়, এটি বৈশ্বিক মূল্যায়ন।

বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েকশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশাল এক মিডিয়া জগৎ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল মাধ্যম কতটা স্বাধীন? আরএসএফ বলছে, অতীতে অনেক সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সহায়ক ছিল। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা কারও সাহসই কেউ পায়নি। অর্থাৎ সরকার বদলালেও সাংবাদিকতার চরিত্র বদলায়নি। বদলায়নি আত্মনিয়ন্ত্রণ, বদলায়নি ভয়।

গণঅভ্যুত্থানের আশা ও বাস্তবতা

এখানেই এসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রশ্নটি সামনে আসে। বহু মানুষের আশা ছিল, এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রব্যবস্থার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও একটি মৌলিক পরিবর্তন আনবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই আশার কিছুই পূরণ হয়নি। সংবাদমাধ্যমের কাঠামো, মালিকানা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সবচেয়ে বড় কথা— ভয়ের সংস্কৃতি, সবই প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও ক্ষমতার প্রতি সাংবাদিকতার সম্পর্ক বা দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি।

সদ্য বিগত বাংলাদেশে সাংবাদিকতা দুই দিক থেকে চাপে ছিল। একদিকে রাষ্ট্রীয় আইন, মামলা, গ্রেফতার। অপরদিকে বেসরকারি শক্তি— রাজনৈতিক কর্মী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও মব। মব আক্রমণ এখনও নতুন এক আতঙ্ক। কোনও প্রতিবেদন বা ফেসবুক পোস্টের জেরে সাংবাদিককে ঘিরে ধরে মারধর ও লাঞ্ছনা— এ যেন প্রকাশ্য বিচারবহির্ভূত শাস্তি। রাষ্ট্র অনেক সময় নীরব দর্শক, কখনও পরোক্ষ সমর্থক। দুঃখজনক হলো, খোদ সাংবাদিকতা পেশার ভেতরেই জন্ম নিয়েছে রাজনৈতিক মব সাংবাদিক ক্যাডার। তারাই ঠিক করছে মিডিয়ায় কে থাকবে আর কে থাকবে না, কে কার সঙ্গে দেখা করতে পারবে, কে পারবে না, কে কোথায় চাকরি করতে পারবে, বা পারবে না।

আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সেল্ফ-সেন্সরশিপ

এই পরিস্থিতিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। কোন খবর করা যাবে, কোনটা যাবে না— এই সিদ্ধান্ত আর সম্পাদকীয় নীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, তা নির্ধারিত হয় সম্ভাব্য মামলার ভয়, হামলার আশঙ্কা আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব কষে। এর ফলাফল ভয়াবহ। সমাজ সত্য জানতে পারে না, ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, গণতন্ত্র ফাঁপা হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে বর্তমান সময়টি দাগ দিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই সাংবাদিক, সম্পাদক আর সমাজের সুশীল অংশ রাজপথে নামছে, লিখছে, বলছে। তাদের বিষয়—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাঁচাবার প্রয়োজন এবং তার জন্য জনসাধারণের সমর্থনের আবেদন। গত ডিসেম্বরে একটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠী দেশের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা অফিস প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলা করেছে, আগুন ধরিয়ে দিয়ে সাংবাদিক ও কর্মীদের পুড়িয়ে মারতে চেয়েছে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীরকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অধ্যাপক ইউনূস ও তার অন্তর্বর্তী সরকারকে একচেটিয়া সমর্থন দিয়ে গেলেও তাদের বিপদে রক্ষা করতে তেমন সাড়া দেয়নি সেই সরকার।

সংবাদমাধ্যমের প্রতি সহিংসতা

সংবাদমাধ্যমের প্রতি উগ্রবাদীদের এমন সহিংসতায় সাংবাদিকরা বিপন্ন বোধ করছেন। গত বছর জুলাই আন্দোলনে এই পত্রিকা দুটি শেখ হাসিনার পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলেই তারা তার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। আর এ জন্য তাদের সরকারি নিপীড়নও ভোগ করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পরও তাহলে এই পত্রিকা দুটি কেন টার্গেট হলো?

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, সবাই মন খুলে সরকারের সমালোচনা করতে পারবে। কিন্তু তার আমলে কিছুই আসলে বলা যায়নি। বলেছে কেবল একটি গোষ্ঠী, যারা কথায় কথায় জান নিয়ে নিতে চায়। কথায় কথায় মব সহিংসতা করে জীবন্ত মেরে ফেলতে চায় মানুষকে। তাই ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে তার ‘প্রিয় ইউনূস ভাইয়ের’ জামানায় বলতে হয়েছিল, “মত প্রকাশ তো দূরের কথা বেঁচে থাকাই দায়।”

লড়াইয়ের উপায়

সংবাদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে নিয়ত সংগ্রাম প্রয়োজন, তা আজ স্পষ্ট। কিন্তু লড়াইয়ের উপায়টা কী? গণতন্ত্রের পথ যদি কঠিন হয়ে যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা ইতিহাস মনে রাখবে। ইতিহাস কেবল ঘটনা লিপিবদ্ধ করে না, সে চরিত্রও বিচার করে। কোন সময়ে কারা নীরব ছিল, কারা ক্ষমতায় থেকেও দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে, ইতিহাস সেসব খুব নির্মমভাবে মনে রাখে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়ে গেল, যেখানে সংবাদমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়া হলো, সাংবাদিকদের পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হলো, আর রাষ্ট্রযন্ত্র দাঁড়িয়ে রইল অসহায় দর্শকের ভূমিকায়।

ইতিহাস মনে রাখবে এই সময়ের কথা— যখন শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভুয়া হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে মাসের পর মাস, বিনা বিচারে জেলে বন্দি করে রেখে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে সম্পাদক ও সাংবাদিকের সঙ্গে।

এগুলো ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশে সরকারের প্রধান ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী, যার নাম বিশ্বজুড়ে নৈতিকতা, মানবতা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন একজন খ্যাতিমান নির্মাতা, যাঁর কাছ থেকে সংবেদনশীলতা ও সৃজনশীল প্রতিবাদের প্রত্যাশা করা অস্বাভাবিক ছিল না।

সরকারের প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশকর্মী, আইনমন্ত্রী ছিলেন একজন অধ্যাপক— শাসন ও নৈতিক দায়িত্ব যাঁর জীবনের মূল দর্শন বলে মনে করা হতো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সামরিক বাহিনীর একজন জেনারেল, আর সরকারি মুখপাত্র ছিলেন একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক। শুধু তাই নয়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বহু পদেই ছিলেন দেশের পরিচিত সাংবাদিকরা।

এমন পরিস্থিতি, সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, গভীরভাবে নৈতিক অপরাধ। ‘সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের স্তম্ভ’— এই বাক্যটি বহুবার বলা হয়েছে, কিন্তু এসব ঘটনার পর তা যেন কেবল পাঠ্যবইয়ের লাইন হয়ে রইল। যখন রাষ্ট্র নিজেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, যখন আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাবানরা নীরব থাকেন, তখন সেই রাষ্ট্র তার গণতান্ত্রিক দাবিও হারাতে বসে।

ইতিহাসের রায়

ইতিহাস এই অধ্যায় ভুলবে না। নামগুলো সে খুব ঠান্ডা মাথায়, খুব নির্মমভাবে লিখে রাখবে— কে ক্ষমতায় ছিল, কে নীরব ছিল, কে প্রতিবাদ করেনি। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রশ্ন করবে— এত মানবাধিকারকর্মী, এত সাংবাদিক, এত বুদ্ধিজীবী একসঙ্গে ক্ষমতায় থেকেও কেন সংবাদপত্র অফিসে আগুন থামানো গেল না? কেন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কারও হলো না? কেন সাংবাদিক নিপীড়ন বন্ধ করা হলো না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো তখনও দেওয়া হবে না। কিন্তু ইতিহাস তার রায় দেবে। নীরবতাও এক ধরনের অপরাধ, আর সেই অপরাধের দাগ ক্ষমতার সব অলংকার ছাপিয়ে চিরকাল থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক