সাংবাদিকদের জাতীয় ডাটাবেজ: সরকারের উদ্যোগে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্ন
সাংবাদিকদের জাতীয় ডাটাবেজ: নতুন বিতর্ক

সাংবাদিকদের জাতীয় ডাটাবেজ: সরকারের উদ্যোগে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্ন

দেশে ‘প্রকৃত সাংবাদিকদের’ জন্য একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরির সরকারি ঘোষণা গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সূচনা করেছে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সম্প্রতি জানিয়েছেন, অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে— প্রকৃত সাংবাদিক কারা? কোন মানদণ্ডে তাদের নির্ধারণ করা হবে? এই দায়িত্ব কি সরকারের হাতে থাকবে, নাকি সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তা নির্ধারিত হবে?

ডাটাবেজ তৈরির পেছনের যুক্তি

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে ‘সাংবাদিক সুরক্ষা সহায়তা সেল’ গঠন করা হয়েছে। এই সেলের মাধ্যমে হুমকি, হামলা বা ডিজিটাল হয়রানির শিকার সাংবাদিকদের আইনি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। নারী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং জেলা পর্যায়ে সুরক্ষা উদ্যোগসহ একটি সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে। সরকারের মতে, এই উদ্যোগগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্যই সাংবাদিকদের একটি যাচাইযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন যুগোপযোগী করার প্রক্রিয়াও বর্তমানে চলমান রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে সাংবাদিক পরিচয়ে নানা অপকর্মের অভিযোগ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। প্রেস কার্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটানো এবং অনিবন্ধিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার প্রশাসন ও সাংবাদিক সংগঠন— উভয় পক্ষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘প্রকৃত সাংবাদিক’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, নিবন্ধিত সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন এবং পেশাগত নৈতিকতা ও আইনি কাঠামোর আওতায় আছেন— তাদেরই সাধারণভাবে ‘প্রকৃত সাংবাদিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডাটাবেজ তৈরির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যে মানদণ্ডগুলো আলোচনায় রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • বৈধ প্রেস কার্ডের উপস্থিতি
  • সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের নিয়োগপত্র
  • সাংবাদিক সংগঠনের সদস্যপদ
  • মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কাজের প্রমাণ
  • ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্বেগের অভাব

ডাটাবেজ তৈরির এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যমের একটি অংশ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। একটি সঠিক ও যাচাইযোগ্য তালিকা তৈরি হলে পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

বিতর্ক ও আশঙ্কার দিক

তবে সাংবাদিকদের আরেক অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, ‘প্রকৃত সাংবাদিক’ নির্ধারণের ক্ষমতা যদি পুরোপুরি সরকারের হাতে চলে যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্র যখন সাংবাদিকের পরিচয় নির্ধারণ করবে, তখন সেটি পেশাগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নাকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ— এ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরির আলোচনা নতুন নয়; প্রায় এক দশক ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।”

তিনি জানান, প্রথমে প্রেস কাউন্সিল এ উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করলে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাদের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি থেমে যায়। পরে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) একটি ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিলেও তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কল্যাণমূলক সুবিধা প্রকৃত সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিতে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকেও ডাটাবেজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্ভাব্য বিতর্ক এড়াতে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয় থেকে সেই উদ্যোগ স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

শিক্ষাগত যোগ্যতার জটিলতা

এম আবদুল্লাহ বলেন, “ডাটাবেজ তৈরির বড় জটিলতা শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, সাংবাদিকতা মূলত বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতানির্ভর পেশা; শুধু একাডেমিক ডিগ্রি দিয়ে ভালো সাংবাদিক নির্ধারণ করা যায় না।” তার ভাষায়, “অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি সাংবাদিকতায় সফল হননি, আবার উচ্চমাধ্যমিক পাস করেও অনেকেই প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক হয়েছেন। দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করে যদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে তা সাংবাদিক সমাজের স্বাগত জানানো উচিত।”

বর্তমান সরকারের সময়ে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে বলেও উল্লেখ করেন এম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা সঠিকভাবে দিতে একটি ডাটাবেজ প্রয়োজন, এমন সিদ্ধান্ত তার দায়িত্ব ছাড়ার আগের বোর্ড সভায় নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে যে ডাটাবেজের কথা বলা হচ্ছে, তা পূর্বের সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা কিনা— তা তিনি নিশ্চিত নন।” সরকারের মতে, একটি যাচাইযোগ্য তালিকা থাকলে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং পেশার মর্যাদা রক্ষা পাবে। চিকিৎসক বা আইনজীবীদের মতো সাংবাদিকদেরও একটি স্বীকৃত ডাটাবেজ থাকা উচিত বলে মনে করছেন তারা।