কক্সবাজারে মানব পাচার রোধে সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে ব্র্যাকের বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত
সম্প্রতি কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রপথে মানব পাচারের একটি প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। আন্দামান সাগর দিয়ে অসংখ্য মানুষ অনিয়মিতভাবে পাচার হচ্ছে, যার ফলে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
কর্মশালার উদ্দেশ্য ও আয়োজন
আজ সোমবার কক্সবাজার শহরের কৃষি বিভাগের হর্টিকালচার মিলনায়তনে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম দিনব্যাপী একটি কর্মশালার আয়োজন করে। এই কর্মশালাটি অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘মাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হয়। কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকদের মানব পাচার, মানব চোরাচালান ও অনিয়মিত অভিবাসনের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং গণমাধ্যমে এই ইস্যুগুলো আরও কার্যকরভাবে উপস্থাপনের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা।
বক্তাদের মূল বক্তব্য
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তিনি মানব পাচারের নানা দিক এবং এর ভয়াবহতা তুলে ধরেন। শরিফুল হাসান বলেন, “মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাওয়ার সময় অভিবাসনপ্রত্যাশী লোকজন দালালের খপ্পরে পড়ে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।” তিনি সাংবাদিকদের প্রতি এই বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সৈকতের সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, “মানব পাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্রেরও সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অপরাধ চক্র ভাঙতে এবং জনসচেতনতা তৈরিতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়
কর্মশালায় গণমাধ্যমে কর্মরত ৫৩ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা পাচার প্রতিরোধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। এ ছাড়া, পাচারের শিকার কয়েকজন ব্যক্তি গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি গভীর শিক্ষণীয় মুহূর্ত ছিল।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি অভিবাসন ও মানব পাচারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “একজন গণমাধ্যমকর্মীকে সংবাদের গভীরে গিয়ে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে হবে।”
প্রতিবেদন তৈরির কৌশল
দৈনিক প্রথম আলোর কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আবদুল কুদ্দুস রানা কর্মশালায় মানব পাচারসংক্রান্ত প্রতিবেদন করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তথ্য যাচাই–বাছাই করে প্রতিবেদন করতে হবে। সংবাদের গভীরে যেতে হবে।” এই আলোচনা সাংবাদিকদের জন্য একটি মূল্যবান নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা মত প্রকাশ করেন যে, প্রস্তুতি নিলে ও জনগণকে সচেতন করা গেলে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, সাংবাদিকেরা তাঁদের কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারেন, অন্যদিকে পাচারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারেন।
এই কর্মশালাটি কক্সবাজারে মানব পাচার রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকভাবে চালু হবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।



