বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দ্বিপক্ষীয় কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়া, রাতের আঁধারে বা সীমান্তের দুর্গম এলাকায় গোপনে ভারত রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে অবৈধ উপায়ে বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার ঘটনাটি ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে, ভারত থেকে পুশব্যাক এবং বাংলাদেশে পুশইনের শিকার কতজন ব্যক্তি বা পরিবার হয়েছে— এই বিষয়ে নির্দিষ্ট চূড়ান্ত সংখ্যা বা সরকারি কিংবা বেসরকারি ঐতিহাসিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া কঠিন। এর মূল কারণ এই প্রক্রিয়াটি অধিকাংশ সময়ই কোনও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি বা আনুষ্ঠানিক ভেরিফিকেশন ছাড়া অত্যন্ত গোপনে ও বিচারবহির্ভূত উপায়ে পরিচালনা করা হয়।
দীর্ঘ সীমান্ত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে— যার বেশিরভাগ অঞ্চল কাঁটাতারের বেড়ায় নিবিষ্ট। এই দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন স্থান দিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তে হত্যা এবং জোরপূর্বক পুশইনের ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিবাদী ভুক্তভোগী নাগরিকরা এবং মানবাধিকার গবেষকগণ প্রায়শঃ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারত রাষ্ট্রের চলমান এই পুশইন এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তৎপরতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির আলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ একটি সুস্পষ্ট ও উদ্বেগজনক হাতছানি বলে অভিহিত করছেন, যা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত।
কোনও আন্তর্জাতিক নিয়ম বা দ্বিপক্ষীয় আইনসম্মত যাচাই-বাছাই (যেমন আনুষ্ঠানিক ‘ডিপোর্টেশন’ প্রক্রিয়া) ছাড়া সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বা অবৈধভাবে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কেবল একটি সাধারণ সীমান্ত সংকট নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র।
গবেষণার পদ্ধতি ও নমুনা
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসব্যাপী বাংলাদেশের তিনটি বিভাগীয় শহরের ২২টি জেলার ৫৬টি গ্রামে পুশইন ইস্যুর সাম্প্রতিক রূপ ও মানবিক সংকট নিয়ে একটি সরেজমিন গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষক দলের প্রধান হিসেবে এই সংবেদনশীল ফিল্ডওয়ার্কে আমাদের সম্পাদিত প্রাতিষ্ঠানিক, পদ্ধতিগত ও মানবিক কাজের সুবিন্যস্ত রূপরেখা নিয়েই আজকের এই প্রবন্ধ।
আমাদের গবেষণার মূল কাজগুলো ছিল— প্রথমত, পুশইনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ভারত থেকে তাদের ধরে আনা, নথিপত্র কেড়ে নেওয়া, সীমান্তে বিএসএফ ও দালালদের আচরণ এবং বাংলাদেশে প্রবেশের পর টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্পগুলো বিস্তারিত নথিবদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে স্থানীয় অংশীজনদের সাথে দলগত আলোচনা করা যাতে করে ৫৬টি গ্রামের বাসিন্দা, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে পুশইনের মাত্রা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর এর সামাজিক প্রভাব বোঝার চেষ্টা করা যায়। সর্বশেষ ছিল নিবিড় কেস স্টাডি তৈরি করা, বিশেষ করে নারী, শিশু এবং আইনি মারপ্যাঁচে পড়া স্বকীয় ব্যক্তিদের ওপর সুনির্দিষ্ট কিছু কেস স্টাডি তৈরি করা হয়েছে— যা পুশইনের চরম মানবিক বিপর্যয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তোলে।
গণমাধ্যমে পুশইনের চিত্র
বিগত সপ্তাহ দুয়েক প্রচার মাধ্যমে (দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম) সীমান্তে পুশইনের শিকার বা পুশইনের চেষ্টারত ব্যক্তিদের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক, মানবিক সংকটে ভরপুর এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। সাংবাদিক ও মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকদের পাঠানো সংবাদ, আলোকচিত্র এবং ভিডিওচিত্রে এই মানুষগুলোর বাস্তব অবস্থা যেভাবে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তার চিত্র এক কথায় ভয়াবহ। টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে প্রায়শই কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে পড়া মানুষের করুণ দৃশ্য প্রচারিত হয়। প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তীব্র রোদ, বৃষ্টি বা শীতের রাতে প্লাস্টিকের শিট বা খোলা আকাশের নিচে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বসে আছেন। তাদের ঘিরে রেখেছে একদিকে ভারতের বিএসএফ, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবি। সংবাদগুলোতে প্রায়ই উঠে আসে যে, সীমান্তের গ্রামবাসী বা স্থানীয় সাংবাদিকরা দূর থেকে বিস্কুট বা পানির বোতল ছুঁড়ে দিচ্ছেন। গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে ভুক্তভোগীদের কান্না এবং ‘আমাদের অপরাধ কী?’ বা ‘আমরা এখন কোথায় যাব?’— এমন আকুতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
দুটি বিপরীত বয়ান
প্রচার মাধ্যমে পুশইন ইস্যুটিকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বয়ানে উপস্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে— একদিকে, ভারতের মূলধারার অনেক গণমাধ্যমে এদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বাংলাদেশি মুসলিম’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যাদের ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ও কিছু আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে বিষয়টিকে একটি বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো হাইলাইট করে যে, সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া বা কূটনৈতিক যোগাযোগ ছাড়াই একতরফাভাবে রাষ্ট্রহীন নাগরিক তৈরির এই চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহের দায়িত্ব বিশ্লেষণের আগে পুশইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৮০-এর দশকে আসামের ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলন ও ১৯৮৫ সালের ‘আসাম চুক্তি’র মাধ্যমে এর সূচনা হয়, যা তৎকালীন বিডিআর প্রতিহত করে। নব্বইয়ের দশকে এটি ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রূপ নেয় এবং ১৯৯২ সালে কংগ্রেস সরকারের আমলে ‘অপারেশন পুশ-ব্যাক’ শুরু হলে একতরফা এই প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করায় সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দেয়। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ আমল ছিল এর সবচেয়ে সহিংস সময়, যখন ২০০৩ সালে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাভাষী মুসলিমদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চিলমারী সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে গুলিবর্ষণে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ভারতে ইউপিএ এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এর তীব্রতা কিছুটা কমে এবং ২০১১ সালের ‘কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চালু হয়। তবে ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং ২০১৯ সালে আসামে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও সিএএ পাসের পর এই প্রবণতা আবার বাড়ে, যার জেরে ২০১৯-২০ সালের শুরুতে বিভিন্ন রাজ্য থেকে অনেক বাংলাভাষী মুসলিমকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি কড়াকড়ি আরোপ করে কয়েকশ মানুষকে আটক করে।
পুশইনের পরিসংখ্যান ও প্রবণতা
যেহেতু পুশইন প্রক্রিয়াটি কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়া রাতের আঁধারে গোপনে ঘটে, তাই এর কোনো স্থায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া কঠিন। তবে ২০১১ থেকে ২০২০ দশকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই হার তুলনামূলক কম থাকলেও ২০১৭ সালের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এটি ব্যাপক গতি পায়। বিএসএফ সদর দপ্তর ও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নথিতে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৯,৬১২ জন মানুষকে সীমান্ত পারাপারের সময় আটক দেখানো হয়েছে। অবশ্য মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই প্রাতিষ্ঠানিক তালিকার বাইরেও একটি বড় অংশ গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী এই চার বছরে প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে। ২০২৪ সালের শেষ ৫ মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (বিশেষ করে ঝিনাইদহের মহেশপুর ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত), ত্রিপুরা ও মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষকে পুশইন করা হয়। ২০২৫ সালটি ছিল এই মেয়াদের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক সময়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে পুশইনের ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করে। মে মাসের প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যেই সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম এবং ফেনী সীমান্ত দিয়ে ১০১১ জনেরও বেশি মানুষকে পুশইন করা হয়। পুরো ২০২৫ সাল জুড়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় ২৫০০ থেকে ৩০০০ মানুষকে পুশইনের করা হয়েছে, যার মাঝে কমপক্ষে ৪৫০ জন রোহিঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেও শীতকালীন কুয়াশার সুযোগ নিয়ে এবং দুর্গম সীমান্ত নদীগুলো ব্যবহার করে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত ছিল। এই দুই মাসে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যার সিংহভাগই বিজিবি স্থানীয় জনগণের সহায়তায় প্রতিহত করেছে বলে বলা হলেও, সরেজমিনে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে যে, বেশিরভাগ ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশে তাদের পরিবারের সাথে সংযুক্ত হয়েছে।
পুশইনের শিকারদের তিনটি ক্যাটাগরি
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ২২টি জেলার ৫৬টি গ্রামে পরিচালিত আমাদের সরেজমিন গবেষণায় দেখা গেছে, সীমান্তে পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা কোনও একক বা সমজাতীয় গোষ্ঠী নন, বরং তাদের পরিচয়, আইনি অবস্থান এবং নাগরিকত্বের পটভূমির ওপর ভিত্তি করে মূলত তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। প্রথম ক্যাটাগরিতে রয়েছেন নথিবিহীন বাংলাদেশিরা, যারা আজ থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে সম্পূর্ণ জীবিকার তাগিদে এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতার খোঁজে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতে গিয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিভিন্ন শ্রমমূলক পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বাংলাদেশে তাদের পারিবারিক শিকড় থাকলেও দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কারণে বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের বাংলাদেশি প্রমাণ করার মতো হালনাগাদ কোনও নথিপত্র তাদের কাছে নেই। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র হিসেবে নথিপত্র কেড়ে নেওয়া মানুষদের দেখা গেছে, যাদের অনেকের কাছেই ভারতের আধার কার্ডের মতো বৈধ নাগরিকত্বের রাষ্ট্রীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত পার করার আগে ভারতের স্থানীয় পুলিশ বা বিএসএফ তা জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে ধ্বংস করে ফেলে, যার ফলে তারা সম্পূর্ণ প্রমাণহীন হয়ে পড়েন এবং ভারত সরকার আইনিভাবে তাদের দায় অস্বীকার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। তৃতীয় ক্যাটাগরিটি হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, যারা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পূর্বে কোনোভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং আমাদের সরেজমিন গবেষণার তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনই ছিলেন রোহিঙ্গা, যার মধ্যে কমপক্ষে ৫ জন সরাসরি ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) দ্বারা নিবন্ধিত আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত শরণার্থী হওয়া সত্ত্বেও তাদের বলপূর্বক পুশইন করা হয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়ের বিবরণ
যখন এই তিন ক্যাটাগরির মানুষদের রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে, মারধর বা চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে সীমান্তের শূন্যরেখায় ফেলে যাওয়া হয়, তখন তারা এক অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের মুখোমুখি হন। আমাদের ফিল্ডওয়ার্কে প্রাপ্ত প্রধান মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে অন্যতম হলো তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট, যার ফলে সীমান্তে বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়ার পর এই মানুষেরা দিনের পর দিন সম্পূর্ণ না খেয়ে বা অর্ধাহারে দিন কাটান এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুরা তীব্র পুষ্টিহীনতা ও পানিশূন্যতায় ভোগেন। এর পাশাপাশি সীমান্তে আটকা পড়া ও রাষ্ট্রহীনতাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা গেছে, যেখানে একদিকে বিএসএফের নজরদারি এবং অন্যদিকে বিজিবির অনুপ্রবেশ ঠেকানোর আইনি অবস্থানের কারণে তারা দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্ত এলাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় আটকা থাকেন। এছাড়া পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও ট্রমার আঘাতও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে, কারণ আকস্মিক এই বলপ্রয়োগের ফলে বহু পরিবার তাদের আপনজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এবং রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে ফেলে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ মেয়াদে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
পুশইনের পেছনের কারণ
সরেজমিন গবেষণায় সংগৃহীত তথ্যের সাথে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং আইনি নথির সত্যতা যাচাই করে দেখা যায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করার পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক, আইনি এবং ভূ-রাজনৈতিক একাধিক কারণ রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভারতের আসাম রাজ্যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি (এআরসি) প্রকাশের রাজনৈতিক সমীকরণ, যার ফলে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৯ লাখ মানুষের একটি বড় অংশকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সুযোগ বুঝে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট এবং জম্মু-কাশ্মীরসহ বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্তকরণের বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে, যেখানে অনেক সময় বৈধ নথিপত্র থাকা অভ্যন্তরীণ হিন্দি বা বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকদেরও কাগজ কেড়ে নিয়ে পরিচয়হীনভাবে সীমান্তে পুশইন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনও দেশের নাগরিক অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করলে রাষ্ট্রীয় আলোচনার মাধ্যমে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে ‘ডিপোর্টেশন’ বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাতের আঁধারে জোরপূর্বক পুশইনের সহজ ও বিচারবহির্ভূত পথ বেছে নেয়। এছাড়া ভারতে অবস্থানরত নথিপত্রহীন বা জাতিসংঘ নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের কেন্দ্রীয় সরকার অভ্যন্তরীণ ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করায় তাদেরও পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যার প্রমাণ ২০২৫ সালের মে মাসে পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিকের উপস্থিতির মাধ্যমে পাওয়া যায়। একই সাথে অতীতে যারা সম্পূর্ণ জীবিকার খোঁজে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ কঠোর আইন ও সীমান্ত নজরদারির কারণে সেই প্রান্তিক অভিবাসী শ্রমিকদেরও কোনও ধরনের আইনি বা মানবিক সুযোগ না দিয়ে ব্যাপকভাবে আটকে পর জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই পুশইন প্রক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিজিবি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বক্তব্য— নিয়মতান্ত্রিক ও বৈধ আইনি চ্যানেল ছাড়া সীমান্ত দিয়ে কাউকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই কারণে বর্তমানে প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর নজরদারি বজায় রাখছে।
পুশইনের শিকারদের সংকট
উল্লেখ্য যে, ২০০৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন বা বলপূর্বক পুশব্যাকের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা এ দেশে প্রবেশ করার পর এক দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আইনি সুরক্ষার অভাব, রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীনতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তাদের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্তের কাছাকাছি আটক হলে তাদের অধিকাংশেরই কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল থাকে না এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বা স্থানীয় পুলিশ তাদের আটক করে ১৯৫২ সালের ‘দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে মামলা দায়ের করে তবে সরেজমিনে গবেষণায় দেখা গেছে পুশইনের শিকার ব্যক্তিবর্গ ও তাদের পরিবার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে মামলার শিকার হয়েছে বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইন অনুযায়ী। ২০২৫ সালে প্রথমদিকে আটক হওয়া ব্যক্তিবর্গ ও তাদের পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইন অনুযায়ী মামলা করা হলেও, পরবর্তীকালে, বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় কোনও প্রকার মামলা ছাড়া পুশইনের শিকার ব্যক্তিবর্গ ও তাদের পরিবারকে নিজেদের গ্রামের স্থানীয় প্রতিনিধি কিংবা নিকট আত্মীয়-স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
অনেক ভুক্তভোগী অপরাধী না হওয়া সত্ত্বেও কিংবা ভারতের আধার কার্ড কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার শিকার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে আইনি লড়াই করার মতো সামর্থ্য বা উকিল পান না, যার ফলে তাদেরকে কমপক্ষে কিছুদিনের জন্য হলেও ‘আন্ডার ট্রায়াল’ কয়েদি হিসেবে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বিচারহীন বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে। এর পাশাপাশি তারা চরম ‘রাষ্ট্রহীনতা’ ও পরিচয় সংকটে ভুগছেন, কারণ ভারত থেকে পুশইন করার সময় তাদের ভোটার আইডি বা আধার কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশেও তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্ম নিবন্ধন পাওয়ার কোনও দৃশ্যমাণ আইনি সুযোগ না থাকায়, ফলে ভারত সরকার তাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বলে দায় এড়ালেও উপযুক্ত কাগজপত্র না থাকায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রও তাদের আইনি নাগরিকত্ব সহজে দিতে পারছে না।
আইনি পরিচয়পত্র বা নাগরিকত্ব না থাকায় বাংলাদেশে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক খাতে তাদের কাজ পাওয়ার সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তারা চরম অর্থনৈতিক ও জীবিকার সংকটে পড়েছেন এবং বেঁচে থাকার তাগিদে পরিচয় লুকিয়ে দিনমজুর, রিকশাচালক, ইটভাটার শ্রমিক বা গৃহকর্মী হিসেবে অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে স্থানীয় নিয়োগকর্তারা অনেক সময় তাদের পরিচয়হীনতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত খাটান ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করেন। একই সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র বা সিম কার্ড না থাকায় তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন না এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করতে পারেন না, যা বর্তমানের ডিজিটাল যুগে তাদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখছে। পরিচয়হীনতার কারণে তারা কোনও স্থায়ী বাসা ভাড়া নিতে না পেরে সাধারণত বস্তি, রেললাইনের ধার বা প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চরম অমানবিক উপায়ে বসবাস করায় মৌলিক অধিকার ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র বড় বাধা হয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পুশইন হওয়া পরিবারের শিশুদের মূলধারার বিদ্যালয়ে ভর্তি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশি নজরদারির ভীতি তাদের তাড়া করে বেড়ানোয় যেকোনো সময় ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কে তারা সবসময় যাযাবরের মতো স্থান পরিবর্তন করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং অনেকসময় পরিবারের ক্ষমতাশীল সদস্যরা বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।
তাছাড়া রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে সীমান্তের ওপারে ফেলে যাওয়ার আকস্মিকতা এবং ভারতের অভ্যন্তরে থেকে যাওয়া নিজেদের পরিবার-পরিজন বা সন্তানদের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে ভুক্তভোগীরা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা তীব্র পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এবং গভীর মানসিক অবসাদে ভুগছেন। এই সংকটের মধ্যে রোহিঙ্গা পুশইনদের দ্বিগুণ সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, কারণ তারা মিয়ানমার ও ভারত দুই দেশ থেকেই বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসার পর না পারছেন ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে, না পারছেন স্থানীয় সমাজে মিশে যেতে, যার ফলে তাদের ওপর নজরদারি ও আইনি কড়াকড়ি আরও অনেক বেশি। পুশইনের শিকার এই প্রান্তিক মানুষেরা বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো আইনি সুরক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তার ছাতা ছাড়াই কেবল টিকে থাকার এক নির্মম লড়াই চালাচ্ছেন এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা এখন এক গভীর মানবাধিকার সংকটের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আন্তর্জাতিক আইন ও করণীয়
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনও দেশের নাগরিক অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাকে যাচাই-বাছাই করে ফেরত পাঠানোর নিয়ম থাকলেও, জোরপূর্বক সীমান্তে মানুষকে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ এই পুশইনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের কাছে একাধিকবার কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে এবং বিজিবি সীমান্তে কড়া নজরদারি বজায় রাখছে। তবে ভারত রাষ্ট্র কর্তৃক সীমান্তে চলমান এই সুসংগঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘন মোকাবিলায় একক কোনও দেশের চেষ্টা যথেষ্ট নয় বলে দুই দেশের সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একটি সমন্বিত কৌশলগত ফ্রন্ট গঠন করা জরুরি।
এর অংশ হিসেবে প্রথমে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত ভুক্তভোগীর সঠিক সংখ্যা ও জবানবন্দি নথিবদ্ধ করতে দুই দেশের মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং দল গঠন করে চিলমারী, মহেশপুর বা খাগড়াছড়ির মতো দুর্গম এলাকায় যৌথ সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও একটি নিরপেক্ষ ডেটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে যেহেতু এর আইনি ও রাজনৈতিক উৎস ভারতে, তাই বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে ভারতের সমমনা আইনি কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় আইনি জোট গঠন করতে হবে, যা ভারতের উচ্চ আদালতগুলোতে একতরফা গণ-বহিষ্কারের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন দায়েরের পাশাপাশি বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের দায়ে বন্দি ভুক্তভোগীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও জামিনের ব্যবস্থা করবে।
বিশ্বমঞ্চে কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরোলো অ্যাডভোকেসি করা প্রয়োজন, যার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের বিশেষ দূতদের কাছে সরেজমিন গবেষণার তথ্যসহ আনুষ্ঠানিক মেমোরেন্ডাম পাঠানো উচিত; বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার দ্বারা নিবন্ধিত রোহিঙ্গাও পুশইনের শিকার হওয়ায় এই সংস্থাকে চিঠি দিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো দরকার। রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া এই গোপন পুশইনের চিত্র বিশ্ব বিবেকের সামনে উন্মোচন করতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টারি প্রকাশের পাশাপাশি ঢাকা, কলকাতা এবং দিল্লি থেকে সমন্বিতভাবে যৌথ প্রেস স্টেটমেন্ট দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানানো উচিত। সর্বশেষ, নীতি-নির্ধারণী চাপ সৃষ্টি করতে দুই দেশের সুশীল সমাজকে পর্দার আড়ালে ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি পরিচালনা করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি করে দুই দেশের পরবর্তী যেকোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ‘একতরফা পুশইন’ বন্ধের বিষয়টিকে আলোচনার প্রধান শর্ত হিসেবে এজেন্ডাভুক্ত করা যায় এবং দ্বিপক্ষীয় সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ট্রানজিট ক্যাম্পে থাকা বন্দীদের আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী খাবার, চিকিৎসা ও নারী-শিশুদের বিশেষ সুরক্ষাকবচ দিতে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী



