মব সহিংসতা: মানবাধিকারের সংকট ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
মব সহিংসতা: মানবাধিকারের সংকট ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

কোনও সভ্য রাষ্ট্রে একজন মানুষের জীবন কেবল একটি জৈবিক অস্তিত্ব নয়—এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার, একটি আইনি সুরক্ষা এবং সর্বোপরি একটি মৌলিক মানবাধিকার। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো—কোনও ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া তার জীবন, স্বাধীনতা কিংবা মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। এই নীতিই আইনের শাসনের ভিত্তি, মানবাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু এবং সভ্যতার অন্যতম অর্জন।

মব সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি

কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মব বা গণপিটুনির ঘটনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মানুষের জীবনের সাংবিধানিক ও মানবিক মূল্য ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। অভিযোগ, সন্দেহ কিংবা গুজবের ভিত্তিতে একদল মানুষ আরেকজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করছে, আর এভাবে জনতার তাৎক্ষণিক রোষ বিচারব্যবস্থার স্থান দখল করছে। এটি শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, এটি মানবাধিকারের মৌলিক দর্শনের বিরুদ্ধে এক ধরনের সংগঠিত সামাজিক সহিংসতা।

পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশে মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ৭১ জন। সংখ্যার বিচারে এটি কেবল পরিসংখ্যান, কিন্তু মানবাধিকারের ভাষায় এটি ৩২টি মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ন্যায়বিচারের অধিকার হরণ

মব সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি একজন মানুষের অপরাধী হওয়ার প্রশ্নকে অতিক্রম করে– তার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকেই অস্বীকার করে। মানবাধিকার দর্শনের মৌলিক নীতি হলো—প্রত্যেক মানুষ, সে যত গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখিই হোক না কেন, ন্যায়বিচারের অধিকার রাখে। কারণ আইনের শাসন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিরপরাধকে অন্যায়ের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত। যে সমাজ এই নীতিকে দুর্বল করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তার ভিত্তিই দুর্বল করে ফেলে।

রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে সংকট

মব সহিংসতার বিস্তার রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটকেও স্পষ্ট করে তুলছে। যখন জনতা নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন রক্ষা করা, সেই দায়িত্বে ব্যর্থতা মানে রাষ্ট্রের দুর্বলতা।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা

বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে মব সহিংসতা ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। সে সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল ও বিলম্বিত। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কিছু বক্তব্য ও অবস্থান জনমনে এমন ধারণা তৈরি করে যে জনচাপ বা মব আচরণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কঠোরতা প্রদর্শিত হয়নি। এর ফলে দণ্ডমুক্তির একটি বিপজ্জনক বার্তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে এ ধরনের সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করে।

স্বাভাবিকীকরণের বিপদ

মব সহিংসতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর স্বাভাবিকীকরণ। যখন বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটে এবং কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায় না, তখন সমাজ ধীরে ধীরে এটিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এই পর্যায়টি কোনও রাষ্ট্রের জন্যই নিরাপদ নয়।

প্রতিকারের পথ

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য। কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং তার কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি মব হত্যাকাণ্ডে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না গেলে দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।

একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানো, গুজব ও উসকানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। কেননা, একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন জনতার হাতে নয়, বরং আইনের সুরক্ষায় থাকবে—এটাই রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিশ্রুতি।

আমরা আশা করবো রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবন রক্ষার্থে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী