মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডংয়ে আরাকান আর্মির হাতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। ২০২৪ সালের ২ মে হোইয়ার সিরি গ্রামে সংঘটিত এই ঘটনায় ১৭০ জনের বেশি গ্রামবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯০ জন শিশু।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির যোদ্ধারা নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালায়। প্রাণভয়ে পালানোর সময় অনেকেই গোলাগুলির শিকার হন। বেঁচে যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা ওমর আহমদ হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেন।
সাক্ষীদের বয়ান
প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা গ্রামবাসীদের মসজিদের পাশে ধানখেতে জড়ো করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তিনি বলেন, 'কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি। আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হন। আরাকান আর্মির সদস্যরা যখন দেখল, তিনি তখনো বেঁচে আছেন; তখন আরও কাছ থেকে কয়েক দফা গুলি চালানো হয়।' আরেক ভুক্তভোগী বলেন, 'ওরা প্রথমে আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর আমার স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে, শেষে আমার আরেক মেয়েকেও গুলি করা হয়।'
মানবাধিকার লঙ্ঘন
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, '২০২৪ সালে রাখাইন রাজ্যে শত শত বেসামরিক রোহিঙ্গাকে হত্যা এবং তাঁদের গ্রামে আগুন দিয়ে আরাকান আর্মি দেশটির জান্তার সঙ্গে চলা সংঘাতকে নৃশংসতার নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। আজও বেঁচে যাওয়া মানুষেরা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে বন্দী অবস্থায় আছেন।'
আরাকান আর্মির অস্বীকৃতি
আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা 'ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান' হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার না করলেও বেঁচে যাওয়াদের অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের জোর করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এলাকাটিতে সফর করেন এবং ভুক্তভোগীদের ভিডিওতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিবেদনের গুরুত্ব
৫৬ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বয়ান, স্যাটেলাইট ছবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার যাচাই করা ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেসামরিক মানুষদের রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি তারা যুদ্ধ আইন লঙ্ঘনও করে থাকতে পারে। অন্যদিকে আরাকান আর্মি বেসামরিক মানুষদের হত্যা ও সম্পত্তি ধ্বংস করে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলা, অগ্নিসংযোগ ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ উঠে। আরাকান আর্মির দাবি, তারা শুধু সামরিক বাহিনীর সদস্য বা সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল, কিন্তু এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে সেই দাবি নাকচ হয়ে গেছে।



