সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ বাতিল এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক হাইকোর্ট বিচারপতি ও সাবেক জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
সোমবার ঢাকায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, এ দুই অধ্যাদেশ বাতিল ও অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় দেশে একটি ‘অস্বাভাবিক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে, যা দেশের জন্য শুভ সংকেত নয়।
সেমিনারে বক্তারা
‘বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিচার বিভাগের গুরুত্ব’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন। সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশে রয়্যাল নরওয়েজিয়ান দূতাবাস। রাজধানীর সিক্স সিজনস হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বিচারপতি মইনুল ইসলামের বক্তব্য
বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু আইন বা কাঠামোগত সুরক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য বিচারকদের মানসিক স্বাধীনতা ও নৈতিক সাহসও প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা স্বাধীন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব বিচারক কি মানসিকভাবে স্বাধীন? উত্তর হচ্ছে, না।
তার ভাষ্য, একজন বিচারকের প্রকৃত স্বাধীনতা তার মানসিক অবস্থানের মধ্যেই নিহিত। জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস বিচারকদের থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের মতামত
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের অন্যতম মৌলিক শর্ত। তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল আদালত।
সুজনের প্রধান নির্বাহী
সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও বাস্তবায়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সবাই চায়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনো সেটি পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।
অন্যান্য বক্তা
সংবিধান ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ সারা হোসেন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের এমন একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচার বিভাগ গড়ে তুলতে হবে, যা মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করবে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ আসিম বলেন, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির বহু বছর পরও বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো ‘চলমান প্রক্রিয়া’। তিনি বলেন, স্বাধীনতা আসলে ভেতরের বিষয়। আপনি নিজেকে স্বাধীন মনে না করলে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ভর করে সুষ্ঠু নিয়োগ, আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। তিনি বলেন, সঠিক নিয়োগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া বাস্তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারওয়ার তুষার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিচার বিভাগীয় সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়া উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় পিছিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখছি। নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়গুলো আবার নতুন করে খোলা হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর কোনও স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই।
বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, বিচার বিভাগীয় সংস্কারের জন্য বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থাকা জরুরি।
সংবিধান ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী, আইনসভা, আর্থিক ও বাহ্যিক সব ধরনের চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি তড়িঘড়ি সংস্কারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, রায় দেওয়ার সময় বিচার বিভাগকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। জনগণের আস্থাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, স্বচ্ছতার অভাব বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিতে বড় বাধা। আদালতের নথি ও কার্যক্রম ডিজিটালি উন্মুক্ত করার পক্ষেও মত দেন তিনি।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ বলেন, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি বলেন, নিম্ন আদালত এখনও প্রশাসনিক ও আর্থিক সম্পদের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত সচিবালয় থাকা উচিত।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মির্জা হাসান, ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, মো. রেজায়ে রাব্বি জায়েদ, রোমানা শোয়েগার ও ড. নূর মোহাম্মদ সরকারসহ অনেকে।



