ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতির তাৎপর্য
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প

তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি শুধু ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে কূটনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ নয়; বরং এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত বহন করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ সম্পর্কে ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশে একটি নতুন সমন্বয় দেখা যাচ্ছে।

কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি

এই পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি হলো এমন ধারণা যে প্রত্যক্ষ সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিলেও দেশটির আচরণ, ক্ষমতার কাঠামো বা কৌশলগত অভিমুখে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে সরাসরি চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে এসে একটি ‘হাইব্রিড’ ও বহুস্তরবিশিষ্ট কৌশল গ্রহণ করছে। এই কৌশলে অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি, ইরানের চারপাশের ভূরাজনৈতিক পরিবেশকে পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সীমানার বাইরের জোট গঠন এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুকে পুনর্বিন্যাস—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কৌশলগত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মূল যুক্তি: ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু চাপ

এই কৌশলগত পরিবর্তনের মূল যুক্তি হলো, ইরানকে একটি বড় ও চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে নয়; বরং একাধিক স্তরে একই সঙ্গে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু চাপ সৃষ্টি করে দুর্বল করতে হবে। লক্ষ্য শুধু ইরানের ওপর বাহ্যিক ব্যয় বাড়ানো নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সময়ে অভ্যন্তরীণ, সীমান্তবর্তী ও আঞ্চলিক নানা ধরনের চাপ মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতার বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। অন্যভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল হলো—ইরানের ভেতরে, তার ভূরাজনৈতিক প্রান্তসীমায় এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কজুড়ে একই সময়ে চাপ সৃষ্টি করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশীয় পর্যায়ের কৌশল

দেশীয় পর্যায়ে এই কৌশল হলো সামাজিক চাপ বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে জনগণের সহনশীলতা ক্ষয় করার ওপর নির্ভরশীল। এর উদ্দেশ্য শুধু সময়–সময় জন–অসন্তোষ বা তীব্র সংকট সৃষ্টি করা নয়; বরং জ্বালানি, পানি, পরিবহন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে শাসন পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে তোলা। নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে এই চাপ যুক্ত হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি অংশ বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে সরে এসে অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দিতেই ব্যয় হবে।

ন্যাটো সম্মেলনের তাৎপর্য

তবে এই কৌশলের অংশটি ইরানের চারপাশের পরিবেশে পরিবর্তন না আনলে পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমনভাবে আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে পুনর্বিন্যাস করতে চায়, যাতে তেহরানকে একই সঙ্গে একাধিক প্রান্তিক ফ্রন্টে ব্যস্ত থাকতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের গুরুত্ব একটি সাধারণ বৈঠকের চেয়ে অনেক দূর ছাড়িয়ে যায়। এটি শুধু ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার মঞ্চ নয়; বরং ইরান ইস্যুকে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংক্রান্ত বিষয়টিকে একটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র পশ্চিমা জোটের যৌথ উদ্বেগে পরিণত করতে চায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটো শুধু একটি সামরিক জোট নয়; বরং ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও বয়ানের সমন্বয় সাধনের একটি মাধ্যম।

চারটি উদ্দেশ্য

এই শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতিকে চারটি পরস্পর-সম্পর্কিত উদ্দেশ্যের আলোকে বোঝা যায়। প্রথম উদ্দেশ্য হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে জোটকে আরও সুসংহত করা। ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনপথের স্থিতিশীলতার মতো ইস্যুগুলোকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে ইরান প্রশ্নে আরও ঘনিষ্ঠ অবস্থানে আনতে চায়। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতার ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—এই বিষয়গুলো সামনে এনে ওয়াশিংটন ইউরোপের উদ্বেগকে নিজের ইরানবিরোধী অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের পদক্ষেপকে বৈধতা প্রদান করা।

তৃতীয় ও চতুর্থ উদ্দেশ্য

তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো তুরস্কের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং দেশটির পারিপার্শ্বিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো। আঙ্কারাকে দেওয়া যেকোনো ছাড়কে যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টার কাঠামোর মধ্যে বুঝতে হবে, যার লক্ষ্য তুরস্ককে তার আঞ্চলিক পরিকল্পনার আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে ঘিরে থাকা সীমান্ত, জাতিগত ও নিরাপত্তাগত গতিশীলতা এ ধরনের কৌশলে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চাপ সৃষ্টির উৎসগুলোকে সক্রিয় করার একটি প্রচেষ্টার অংশ। চতুর্থ উদ্দেশ্য হলো সিরিয়ার সক্ষমতাকে ব্যবহার করে লেবাননের ওপর প্রভাব বিস্তার করা এবং হিজবুল্লাহর ওপর চাপ আরও বাড়ানো। যদি ধরে নেওয়া হয় যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্ক-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করছে, তাহলে এই চার উদ্দেশ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। এগুলো একই শৃঙ্খলের অংশ, যার উদ্দেশ্য ইরান এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ ওপর রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও মাঠপর্যায়ের চাপ আরও বাড়িয়ে তোলা।

কৌশলের ব্যর্থতা

সবকিছু একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র একটিমাত্র উপায়ের ওপর নির্ভর না করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে পরস্পর সংযুক্ত নানা ধরনের চাপের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করছে। অভ্যন্তরীণ চাপ, ইরানের সীমান্তজুড়ে চাপ, আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে সৃষ্ট চাপ—সবই এই অভিন্ন কৌশলের অংশ। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের অনুকূলে পুনর্নির্ধারণ করা এবং ইরানকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া, যাতে দেশটি একযোগে একাধিক ফ্রন্টের সংকট মোকাবিলাতেই তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে বাধ্য হয়। তবে এই কৌশল নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়েছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক সমর্থন এবং জটিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের বহু পরিকল্পনা বাস্তব পরিস্থিতি, স্থানীয় বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিরোধ শক্তিগুলোর গভীরভাবে প্রোথিত দৃঢ়তার মুখে ক্ষয়, বিঘ্ন ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তদুপরি, শীর্ষ নেতার জানাজায় ইরান ও ইরাকে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ আবারও দেখিয়েছে যে পশ্চিম এশিয়ায় একটি প্রকৃত ও টেকসই ব্যবস্থা মার্কিন পরিকল্পনা মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং তা গড়ে ওঠে জনগণের সামাজিক ইচ্ছাশক্তি, প্রতিরোধের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া বন্ধনের ভিত্তিতে।

ফরহাদ পাশাভান্ধ আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষক আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং সংক্ষেপিত।