রাজধানীর গুলশান এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা আঁকা রিকশা চোখে পড়ার পর এবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনেও উড়ল মার্কিন পতাকা। শনিবার বিকালে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের আয়োজনে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মিউজিক্যাল পারফরম্যান্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমাদের সংসদ ভবনের নকশা করেছেন বিখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান। ঠিক তেমনি আমেরিকার স্থাপত্য নির্মাণে অনন্য অবদান রেখেছেন বিশিষ্ট বাংলাদেশি-আমেরিকান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খান। এই পারস্পরিক অবদান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ও আমেরিকা আক্ষরিক অর্থেই একে অপরের ইতিহাস বিনির্মাণে সহায়তা করেছে।’
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক স্বার্থ এবং অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামীতে আরও সুদৃঢ় হবে, যেখানে দুই দেশের টেকসই উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন অবদান ও যৌথ অঙ্গীকার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।’
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রশ্ন
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। জর্জ হ্যারিসনের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ব্যতিক্রম হলেও মার্কিন সরকারের অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। সেই দেশের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে তাদের পতাকা ওড়ানো কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপের গুঞ্জন। এই বাস্তবতায় সংসদ ভবন চত্বরে মার্কিন পতাকা উত্তোলনের ঘটনাকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
প্রশ্ন উঠেছে, যদি ভারত বা পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে সংসদ ভবনে তাদের পতাকা উড়ানো হতো, তাহলে প্রতিক্রিয়া কী হতো? দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতো কিনা? ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সহযোগী আমেরিকার পতাকা কেন সংসদে উড়বে?
বাংলাদেশে বন্ধুপ্রতীম যেকোনো দেশের স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি সংসদ ভবনের মতো জায়গায় সেই দেশের পতাকা উড়িয়ে কেন? অনুষ্ঠানটি দূতাবাসে বা কোনো মিলনায়তনে হতে পারতো। সংসদের অভিভাবক স্পিকার ইরানের প্রয়াত নেতার শেষকৃত্যে অংশ নিতে ইরানে থাকাকালে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ভারত ও চীনের কাছে কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকারও বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ ও মিয়ানমারে নজরদারির স্বার্থ রয়েছে। তাই এই অঞ্চলে যেকোনো দেশের তৎপরতাকে সন্দেহের চোখে দেখা দরকার।
জাতীয় সংসদ ভবনে অন্য কোনো দেশের পতাকা ওড়ানো শোভন ও যৌক্তিক নয়। বন্ধুত্বের পরিচয় নানাভাবে দেয়া যায়, কিন্তু সেটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে না। সর্বোপরি, সংসদ ভবনে মার্কিন পতাকা ওড়ানো কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়।



