তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাইলফলক: মাহদী আমিন
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর সম্পর্কের মাইলফলক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরে কুয়ালালামপুরের ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

সাংস্কৃতিক সমঝোতা ও নোট বিনিময়

মাহদী আমিন বলেন, সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি Memorandum of Understanding স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। এছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে ২টি এক্সচেঞ্জ অব নোটস বিনিময় করা হয়েছে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পাঁচটি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া এবং এমএমসি পোর্ট।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

স্বল্পসময়ের এই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক, এরপর সীমিত পরিসরে এবং পরে ডেলিগেশন পর্যায়ে বৈঠক হয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেলিগেশন মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন। পরে মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকসমূহে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্তকরণের আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী তার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী অভিবাসন ব্যয় কমানো, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ঐকমত্য পোষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী দ্রুততার সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুনরায় উন্মুক্তকরণের আহ্বান জানান এবং স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অনুরোধ জানান।

কারাগারে অন্তরীণ শ্রমিকদের বিষয়ে আলোচনা

বিভিন্ন কারণে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধ অবস্থায় রয়েছেন বা কারাগারে অন্তরীণ আছেন, তাদের মানবিক ও সহানুভূতিশীল উপায়ে বৈধতার আওতায় আনা বা নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আন্তরিক অনুরোধ জানান। উভয় বৈঠকে মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করা হয়।

জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ

মাহদী আমিন বলেন, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একমত হয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এবং আরসিইপি’তে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা হয়।

ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা

ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান দুই নেতা। তারা জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় যৌথভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা

জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের সরকার একত্রে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

বিভিন্ন খাতে আলোচনা ও ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি

মাহদী আমিন বলেন, এবারের ঐতিহাসিক সফরে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর খাত, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ ও কল্যাণ, শিক্ষা ও পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহায়তা সম্প্রসারণ—এসব খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সর্বমোট ৯টি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্মতিতে ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি ইস্যু করা হয়েছে।

প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা

আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে, বিশেষ করে প্রযুক্তি পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ভূমিকার প্রশংসা

মাহদী আমিন জানান, যৌথ প্রেস কনফারেন্সে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্যাগ ও সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ভিন্নমাত্রিক ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্মরণ করেন।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসা খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে একসাথে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। হালাল শিল্প ও ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করে দুই দেশ একমত হয়।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। দুই দেশের সরকার প্রধান শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে একমত পোষণ করেন। কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার, সামরিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

১৮ ঘণ্টার ফলপ্রসূ সফর

মাহদী আমিন বলেন, মাত্র ১৮ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরে যে আলোচনা, সমঝোতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তা আগামী দিনে দুই দেশের জন্য বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী রোববার দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়া আসেন এবং আজ সন্ধ্যায় চার দিনের সফরে চীনে যাবেন।