দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের স্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হিকে ঘুষের বিনিময়ে বিলাসবহুল উপহার গ্রহণের দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। শুক্রবার (২৬ জুন) সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই রায় ঘোষণা করে।
রায়ের বিবরণ ও জব্দকৃত উপহার
আদালত রায়ে বলেন, বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কিম মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে পৃথক এক মামলায় ইউনিফিকেশন চার্চের কাছ থেকে উপহার গ্রহণ এবং শেয়ারবাজারে কারসাজি থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগে আপিল আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক জো সুন-পিয়ো বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সর্বোচ্চ সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কিন্তু কিম কিয়ন হি সেই সামাজিক দায়িত্ব পালন না করে নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বারবার মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেছেন।’
আদালত কিমের কাছ থেকে পাওয়া সব উপহার রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের হীরার নেকলেস, টিফানির ব্রোচ, ডিওরের হ্যান্ডব্যাগ, সোনার কচ্ছপের মূর্তির সংরক্ষণ বাক্স এবং খ্যাতিমান শিল্পী লি উফানের একটি চিত্রকর্ম।
কিমের অবস্থান ও আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
ধূসর রঙের স্যুট ও সাদা মাস্ক পরে আদালতে উপস্থিত কিম মাথা নিচু করে রায় শোনেন। তিনি উপহার নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছেন, সেগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের সুবিধা আদায়ের সম্পর্ক ছিল না। গত বছরের আগস্টে গ্রেফতারের পর থেকে একাধিক মামলায় তার বিচার চলছে।
রায়ের পর কিমের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই ‘শিথিল ব্যাখ্যার’ ভিত্তিতে এই রায় দেওয়া হয়েছে। তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
ইউন সুক ইওলের মামলা ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভূমিকা
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অপসারিত হন ইউন সুক ইওল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক আইন জারির ঘটনায় অভিশংসনের পর তিনি ক্ষমতা হারান। বর্তমানে বিদ্রোহ, সামরিক আইন জারি এবং উত্তর কোরিয়ার রাজধানীর ওপর ড্রোন উড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির অভিযোগসহ একাধিক মামলার বিচার চলছে। বিদ্রোহের মামলায় তার বিরুদ্ধে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেক মামলায় ৩০ বছরের সাজার বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
ইউনের স্থলাভিষিক্ত বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ক্ষমতায় এসে সামরিক আইন জারি এবং ইউন প্রশাসন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে একাধিক বিশেষ তদন্তের অনুমোদন দিয়েছেন।
বিশেষ কৌঁসুলির অভিযোগ ও অন্যান্য মামলা
বিশেষ কৌঁসুলি গত ডিসেম্বরে কিমের বিরুদ্ধে ঘুষের বিভিন্ন অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে ২০২২ সালে সিওহি কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান লি বং-কোয়ানের কাছ থেকে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ ওন (প্রায় ৯০ হাজার মার্কিন ডলার) মূল্যের হীরার নেকলেস ও অন্যান্য গয়না নেওয়ার অভিযোগও ছিল। অভিযোগে বলা হয়, এর বিনিময়ে চেয়ারম্যানের জামাতার জন্য সরকারি পদ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন কিম। আদালত এই অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দেন। একই মামলায় লি বং-কোয়ানকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তা দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আদালত কিমকে আরও কয়েকটি ঘুষের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মধ্যে রয়েছে রোবোটিক কুকুর প্রকল্পে সরকারি সহায়তার প্রত্যাশী এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দামি ঘড়ি গ্রহণ, সরকারি প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্তির আশায় এক পাদ্রির দেওয়া ডিওরের হ্যান্ডব্যাগ ও অন্যান্য উপহার গ্রহণ, সরকারি পদ পাওয়ার তদবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে সোনার কচ্ছপের মূর্তি, ঐতিহ্যবাহী চিত্রকর্ম এবং প্রায় ১৪ কোটি ওন (প্রায় ৯১ হাজার মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি শিল্পকর্ম গ্রহণের অভিযোগ।
আদালত এসব মামলায় জড়িত কয়েকজনকে স্থগিত কারাদণ্ড এবং একজনকে অর্থদণ্ডও দিয়েছেন।



