অযোধ্যার রাম মন্দিরে দানবাক্স থেকে কোটি কোটি টাকা চুরি, এসআইটির প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য
রাম মন্দিরে দানবাক্স চুরি: এসআইটির প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ভারতের অযোধ্যার রাম মন্দিরের দানবাক্স থেকে কোটি কোটি রুপি আত্মসাতের ঘটনায় বিশেষ তদন্ত দলের (এসআইটি) অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্তে দেখা গেছে, অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করে এবং চুরি করা টাকা প্রথমে মন্দিরের টয়লেটে লুকিয়ে রেখে পরে বাইরে পাচার করতেন। এনডিটিভির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দুই ট্রাস্টি পদত্যাগ, আটজন গ্রেফতার

তদন্তের অগ্রগতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার নৈতিক দায় স্বীকার করে রাম মন্দির ট্রাস্টের দুই কর্মকর্তা চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। এদিকে মামলায় গ্রেফতার আট অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

ঘাটতি ধরা পড়ায় শুরু তদন্ত

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্দিরের দানবাক্স খালি করে ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থের হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রথমে অনিয়মের বিষয়টি ট্রাস্টের নজরে আসে। সাধারণত একটি দানবাক্সে ৬ থেকে ৭ লাখ রুপি থাকার কথা থাকলেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ৫০০ রুপির নোটের বান্ডিলে ঘাটতি ধরা পড়ে। এরপর সন্দেহের ভিত্তিতে অর্থ গণনার কক্ষে গোপন ক্যামেরা বসানো হয়। সেই ফুটেজে দেখা যায়, একজন কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্য আড়াল করতেন। এ সময় তার সহযোগী নোটের বান্ডিল থেকে টাকা বের করে নিজের পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলতেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আত্মসাতের কৌশল ও টয়লেটে টাকা লুকানো

এসআইটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আত্মসাতের আরেকটি কৌশলও ব্যবহার করা হতো। অভিযুক্তরা নোটের বান্ডিলে অতিরিক্ত নোট ঢুকিয়ে রাখতেন। পরে শুধু বান্ডিলের সংখ্যা গুনে ভাউচার তৈরি করা হতো। ব্যাংকে অর্থ পাঠানোর আগে সেই অতিরিক্ত নোট সরিয়ে নেওয়া হতো। ফলে কাগজে-কলমে হিসাব ঠিক থাকলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হতো। তদন্তে আরও জানা গেছে, চুরি করা অর্থ প্রথমে মন্দির চত্বরে থাকা টয়লেটে লুকিয়ে রাখা হতো। পরে সুযোগ বুঝে তা বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং অন্য একটি স্থানে ভাগ করে নেওয়া হতো।

৭০টি চুরির ঘটনা শনাক্ত

সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালে মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই এই চক্র সক্রিয় ছিল। এসআইটির অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজে অন্তত ৭০টি চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার নামও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি আরও কয়েকজন সরকারি কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ক্ষতির পরিমাণ ও উদ্ধার অর্থ

যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি রুপি আত্মসাতের দাবি করা হয়েছে, তবে এখনো সরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ জানানো হয়নি। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো গণনার কাজ চলছে। তদন্তকারীদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

অভিযুক্তদের পরিচয় ও নিয়োগে অনিয়ম

এসআইটির প্রতিবেদনে আট অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন নগদ অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লাভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পান্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদব। তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের অনেকেই সুপারিশের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছিলেন। যেমন, ট্রাস্টের প্রশাসনিক কর্মী ও চম্পত রায়ের সাবেক চালক তিন্নু যাদব তার চাচাতো ভাই মনীশ যাদবকে অর্থ গণনার দলে নিয়োগ করান। একইভাবে অনুকল্প মিশ্র তার ভগ্নিপতি লাভকুশ মিশ্রকেও একই দলে যুক্ত করেন।

নিরাপত্তা গাফিলতি ও স্বর্ণালংকার চুরি

এসআইটি আরও জানিয়েছে, দায়িত্ব শেষে কর্মীদের শরীর তল্লাশি না করায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের গাফিলতি ছিল। এই সুযোগেই তারা দানবাক্স খোলার কক্ষ থেকেই নিয়মিত টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরি করতেন। তদন্তে আরও অভিযোগ উঠেছে, অবিনাশ শুক্লা চুরি করা অর্থ নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতেন। শুধু নগদ অর্থই নয়, ভক্তদের দান করা স্বর্ণালংকারও আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে কানের দুল, নাকফুল, চুড়ি, রামলালার জন্য উৎসর্গ করা গয়না এবং নূপুরও ছিল।

মূল পরিকল্পনাকারী ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় অসঙ্গতি

এসআইটির প্রতিবেদনে তিন্নু যাদব ও সুভাষ শ্রীবাস্তবকে পুরো চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এই দুজনের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সুভাষ শ্রীবাস্তব অন্যদের দলে ভেড়ানো এবং অর্থ গণনার দায়িত্ব বণ্টনের কাজ দেখতেন। এ ছাড়া গত তিন বছরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পর্যালোচনায় দানবাক্সের সংখ্যা ও হিসাবের মধ্যে অসঙ্গতি, অপর্যাপ্ত সিসিটিভি নজরদারি, অর্থ গণনার রেকর্ড সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং তদারকির ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাবের বিষয়ও চিহ্নিত করেছে এসআইটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা আগেই শনাক্ত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নিরাপত্তা প্রোটোকল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং নিয়ম মেনে চলা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা।

প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা কয়েক শতাব্দী পুরোনো বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেখানে এই রাম মন্দির নির্মাণ করা হয়। মসজিদ ভাঙার এই ঘটনা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তবে উদ্বোধনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় এই বড় ধরনের দুর্নীতি সামনে আসল।