ভারতের অযোধ্যায় রামমন্দিরের দানপাত্র লুটের ঘটনায় অবশেষে মুখ খুলল হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, যারা চুরি করেছে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, চুরির ঘটনা ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছে এবং এটা বরদাশত করা হবে না।
আরএসএসের অবস্থান ও বিভ্রান্তি
হোসাবলে আরও বলেন, এই লুটের ঘটনায় সর্বত্র চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, যার অবসান ঘটাতে হবে। বিতর্কিতভাবে গড়ে ওঠা রামমন্দির ও তার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ সদস্যদের অধিকাংশই সংঘ ও সংঘের চেতনায় গঠিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যাঁরা মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে অভূতপূর্ব এই চুরির ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই দায় পড়ছে সংঘ নেতৃত্বের ওপর।
এক মাস কেটে গেলেও এ ঘটনা নিয়ে আরএসএসের কেউ মুখ খোলেনি। হোসাবলেই প্রথম। তাঁর বিবৃতির নানা রকম ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। যেভাবে তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দানের কথা বলেছেন, তাতে মনে করা হচ্ছে, আরএসএস এ ঘটনার দায় পরোক্ষে ভিএইচপির ওপর চাপিয়ে নিজেদের আড়াল করতে চাইছে।
লুটের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা
লুটের ঘটনায় যাঁদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে, তাঁরা সবাই সংঘের আদর্শে বড় হয়েছেন। যে তিনজনের বিরুদ্ধে বিরোধী আক্রমণের তির ধাবিত, সেই চম্পত রাই, অনিল মিশ্র ও গোপাল রাও ভিএইচপির নেতা। সংঘ ঘনিষ্ঠদের এই বিচ্যুতি আরএসএস মোটেই ভালোভাবে নেয়নি। হোসাবলের বিবৃতি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। কারণ, চুরিকাণ্ড সংঘের ভাবমূর্তিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিরোধীরা প্রচার শুরু করেছে, লুটের একাংশ সংঘের কোষাগারে জমা পড়েছে। এ কারণেই এক শ বছর ধরে আরএসএস নথিভুক্ত হয়নি।
হোসাবলে এই ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ঘটনাকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর আশা, মন্দির পরিচালনার ব্যবস্থাপনায় যেসব ত্রুটি রয়েছে, তা সংশোধন করা হবে। এখন দেখার বিষয়, ৬ জুলাই ট্রাস্টের বৈঠকে চম্পত রাই, অনিল মিশ্র ও গোপাল রাওদের পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হয় কি না।
তদন্ত ও বিরোধীদের প্রশ্ন
তদন্ত শুরুর পর চম্পত ও অনিল পদত্যাগ করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁদের জেরা করলেও কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এফআইআর দাখিল করা হয়নি। তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি। কেন এই রক্ষাকবচ, বিরোধীরা সেই প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরগরম।
আরএসএস অবশ্য এই সঙ্গে অন্য এক বার্তাও দিয়ে রেখেছে। লুটের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে হিন্দুত্ববাদী সমর্থনে যাতে ঘা না দেয়, সেই কারণে তিনি হিন্দুবিরোধী শক্তিদের সজাগ করে দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হিন্দুবিরোধী ও দেশবিরোধী শক্তি এ দুঃখজনক ঘটনাকে হাতিয়ার করে হিন্দুধর্মকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে হিন্দুদের একজোট থাকতে হবে। তিনি বলেছেন, হিন্দুদের ধৈর্য ধরতে হবে। সংযম দেখাতে হবে। জোটবদ্ধ থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা
চুরি ধরা পড়ার এতদিন পর আরএসএস মুখ খুললেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো নীরব। অথচ তাঁরই উদ্যোগে কেন্দ্রীয় সরকার মন্দির নির্মাণ ও মন্দির পরিচালনের জন্য দুটি ট্রাস্ট গঠন করেছে। সেই ট্রাস্টে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছে। মন্দিরের শিলান্যাস থেকে শুরু করে ‘দেবতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা’, প্রতিটি অনুষ্ঠানই হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের উপস্থিতিতে। অথচ এত বড় ঘটনার পরেও প্রধানমন্ত্রী এখনো কেন নীরব, সেই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলেরা।
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভগবান রাম ও জনগণের বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে অসুবিধে কোথায়? ভগবানের সম্পদ লুটের ঘটনায় দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। আপনার মনোনীত ব্যক্তিরা সংঘ পরিবারের নেতৃত্বে এই লুট চালিয়েছে। এটা আপনার পাপ। আপনি এর চেয়েও বড় পাপ করছেন এই বিষয়ে নীরব থেকে।’
ভিএইচপির অবস্থান
চুরি নিয়ে আরএসএস ও ভিএইচপির মধ্যে সূক্ষ্ম টানাপোড়েন চললেও সংগঠন হিসেবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদও (ভিএইচপি) চুরির দায় নিতে নারাজ। ভিএইচপি সভাপতি অলোক কুমার এক সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চুরির দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, চম্পত রাই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অপকর্মের দায় ভিএইচপি নিতে পারে না। তুলনা দিয়ে অলোক বলেন, সরকারি আধিকারিকেরা কোনো ক্লাবের সদস্য হতেই পারেন। তিনি সেই ক্লাবের সম্পদ চুরি করলে সরকারকে কি দায়ী করা যায়? তিনি বলেছেন, ‘কে অপরাধী কে নন, তা তদন্তকারী কর্তারা ঠিক করবেন। আমরা চাই, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কাউকে যেন রেয়াত করা না হয়।’
ভিএইচপি সভাপতির এই মনোভাব থেকে মনে করা হচ্ছে, চম্পত রাই, অনিল মিশ্র বা গোপাল রাওদের থেকে ভিএইচপি দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলেছে। আরএসএসের মতো তারাও চুরির দায় নিতে নারাজ। এর ফলে ৬ জুলাই ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের’ বৈঠকের আগ্রহের কেন্দ্রে চম্পত রাইয়েরা চলে এসেছেন। দেখার এটাই, তাঁদের বাদ দিয়ে ট্রাস্ট পুনর্গঠিত হয় কি না।



