সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হত্যার গোপন পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে। ব্রাজিলের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবারের দাবি, এই চক্রান্তের সাথে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জড়িত ছিল। তবে পাকিস্তানের একজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এই দাবিকে ‘পুরোপুরি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
কী ঘটেছিল সুইজারল্যান্ড বৈঠকে?
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অংশ নেন। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা।
এসকোবারের মতে, ওই বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এই চক্রান্তের কথা ফাঁস করে দেয়। ঘটনার পর পাকিস্তান তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, তাদের প্রতিনিধিদলের ওপর কোনো হামলা হলে তার চরম জবাব দেওয়া হবে।
পাকিস্তানের কঠোর অস্বীকার
পাকিস্তানের একজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এসকোবারের দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সুইজারল্যান্ড সফরে এ ধরনের কোনো হুমকির ঘটনাই ঘটেনি।” তিনি আরও জানান, লুসার্ন শহরে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের অবস্থানের পুরো সময়ে সুইজারল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না, এমনকি অস্বাভাবিক কোনো উদ্বেগের কারণও ঘটেনি।
সরকারিভাবে এ দাবি অস্বীকার করা হলেও আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বেশ নজর কেড়েছে। কারণ, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান বেশ দৃশ্যমান ও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করছে।
পাকিস্তানের জটিল কূটনীতি
সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাড়তে থাকা অস্থিরতার পর ইসলামাবাদ নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে একটি সেতু বা মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা, কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও আলোচনাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তান একদিকে যেমন আঞ্চলিক শান্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থানের কথা বলছে, অন্যদিকে ইরান ও মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইসরায়েলেরও খোলাখুলি সমালোচনা করছে। ফলে দেশটি এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় সহায়তা করছেন।
ইসলামাবাদ তার পুরোনো অংশীদারদের আশ্বস্ত করতে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রেখেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান স্পষ্ট করতে চাইছে যে তারা তাদের মধ্যস্থতার লক্ষ্য ঠিক রেখেই আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে জটিল সম্পর্কগুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
হত্যাচেষ্টার দাবির প্রভাব
পাকিস্তানের জন্য চলমান এ কূটনৈতিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থানকে উঁচুতে নেওয়ার ও বিশ্বের অন্যতম অস্থির একটি রাজনৈতিক অঞ্চলে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করার বড় সুযোগ। তবে সরাসরি অস্বীকার করা সত্ত্বেও, সেনাপ্রধান মুনিরকে হত্যাচেষ্টার মতো চাঞ্চল্যকর দাবির উত্থান প্রমাণ করে, পর্দার পেছনের আলোচনাগুলো ঘিরে কতটা গভীর নজরদারি, জল্পনা-কল্পনা ও ঝুঁকি জড়িয়ে রয়েছে।



