দেশে সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষ বেড়েছে: টিআইবি জরিপ
দেশে সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষ বেড়েছে: টিআইবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

জরিপের মূল তথ্য

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে জাতীয়ভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হয়েছেন পাসপোর্ট ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে। তবে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এরপরও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং ও ভূমি খাতে গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঘুষের পরিমাণ ও বাজেটের তুলনা

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার এখনও অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ’র মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেও দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা বেড়েছে বা আগের মতোই রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রাম ও শহরের পার্থক্য

এই জরিপে গ্রাম ও শহরের মধ্যে দুর্নীতির অভিজ্ঞতায়ও পার্থক্য উঠে এসেছে। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরে এ হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ঘুষের পরিমাণের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের মানুষকে তুলনামূলক বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। শহরে গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ টাকা এবং গ্রামে ৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় তাদের বার্ষিক আয়ের বড় অংশ ঘুষ হিসেবে দিতে বাধ্য হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং প্রান্তিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নারী ও ডিজিটাল সেবা

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা এবং শিক্ষা খাতে নারী সেবাগ্রহীতাদের উল্লেখযোগ্য হারে দুর্নীতির শিকার হওয়ার বিষয়টি এসব খাতে নারীদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করছে বলেও জানিয়েছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের দালালনির্ভরতা ও ঘুষ প্রদানের ঝুঁকি বহাল রয়েছে। ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল পদ্ধতির মিশ্র ব্যবস্থার কারণে সেবা পেতে অতিরিক্ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।

দুর্নীতির কারণ ও অভিযোগ

দুর্নীতির কারণ হিসেবে অধিকাংশ উত্তরদাতা বিচারহীনতা, জনসচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন। ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ খানা জানিয়েছে, ‘ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না’। টিআইবির মতে, এটি ঘুষ আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেরই প্রমাণ।

জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক খানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। দুদক সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ খানা অবগত থাকলেও অভিযোগ দায়েরের হার অত্যন্ত কম।

অভিযোগ করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাওয়া যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এক-পঞ্চমাংশের বেশি ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণই করা হয়নি এবং ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। দুর্নীতির শিকার হওয়া ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ খানা মনে করে, “সেবা নেওয়ার ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত, তাই অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই।”