ইরানের কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন: ইউরোপকে হাতিয়ার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে দেশটিকে সমঝোতায় বাধ্য করতে একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন। তিনি গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত এবং ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রস্তাবনা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে অবহিত করছেন। এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরান এখন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ইউরোপকে একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার ধারা
নিষ্পত্তি না হওয়া আলোচনার পর আরাগচি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বাহো, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডাফুল, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ২১ ঘণ্টার নিবিড় আলোচনার পরও পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে গেছে বলে ইরান মনে করে না। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে চললেও, এখন ইরান তাদের অবস্থান পরিবর্তন এনেছে।
আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব এবং ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর তীব্র চাপের লক্ষণ দেখে ইরান ইউরোপকে ট্রাম্পের ওপর চাপ দেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করছে। ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধের জন্য সামরিক সহায়তা প্রদানের বিষয়ে ট্রাম্পের দাবির প্রতি কিছুটা সম্মান দেখাতে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় নৌ-জোট গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছে, যদিও এই উদ্যোগ কেবল বর্তমান সংঘাত শেষ হওয়ার পরই কার্যকর করা হবে।
হরমুজ প্রণালি ও টোল ব্যবস্থার জটিলতা
যেকোনো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে টোল আদায়ের বিষয়ে তাদের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ত্রিতা পারসি উল্লেখ করেন, ‘ইরানিরা সম্ভবত এটি দেখার চেষ্টা করবে যে, ইউরোপীয়দের অবস্থান আগের তুলনায় তাদের দিকে কতটা সরানো সম্ভব। কারণ ইরানের দৃষ্টিতে ইউরোপ আগে যুক্তরাষ্ট্রের চরম অনুগত ছিল।’ বিশেষ করে ইরান তুলনামূলক কম টোল ফি নির্ধারণ করে দ্রুত এই প্রক্রিয়াটি চালু করার চেষ্টা করছে, যাতে যত বেশি সম্ভব দেশকে এর আওতায় আনা যায়।
ইরানের পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, শুধু তেলের ট্যাংকার নয়, সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপরই নতুন এই টোল কার্যকর হবে। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে হওয়া বাণিজ্যের ১১ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবহন করা মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশই কেবল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই টোল ব্যবস্থা টেকসই নাও হতে পারে, কিন্তু ইরান প্রতিরোধের একটি নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছে, যা পারমাণবিক বোমা অর্জনের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।
ইউরোপের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগ নিয়ে তেহরান এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত জানায়নি, এর আংশিক কারণ হলো এই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সদস্য নিত্য লাভ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন হতে পারে, এবং যেকোনো চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই পক্ষ হিসেবে রাখতে হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, এর জন্য সম্ভবত সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এই প্রণালির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের ভেতরে ট্রাম্পের বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো সোফিয়া ব্যাশ উল্লেখ করেন, ইরানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার আরও সমালোচনা করা ইউরোপের নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় দেশগুলোর পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হওয়ার বিষয়ে জনগণের যে মৌন সমর্থন রয়েছে, তা যদি আমরা বজায় রাখতে চাই, তবে আমরা সামরিক হঠকারিতা এবং একতরফা যুদ্ধকে অনুসরণ করতে পারি না।’
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের কূটনৈতিক কৌশল এবং ইউরোপের সম্ভাব্য ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।



