ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা এড়িয়ে ভারতের কূটনৈতিক নীরবতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানালেও এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বিবৃতিতে ইসলামাবাদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ না করায় দেশটির রাজনৈতিক মহলে এবং বিশ্লেষকদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ভারতের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে একঘরে করার যে নীতি নরেন্দ্র মোদির সরকার গ্রহণ করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই সেই কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে। ভারতের বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে একটি 'কূটনৈতিক আঘাত' হিসেবে বর্ণনা করে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় এবং আশা করে যে এটি পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। বিবৃতিতে সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে দিল্লি সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন, ভারত কোনো 'মিডলম্যান' বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হতে চায় না। তবে সমালোচকরা বলছেন, পাকিস্তান যখন বৈশ্বিক এই সংকটে অনুঘটক হিসেবে সফল হয়েছে, তখন ভারতের এই নীরবতা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করছে।
কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি এবং সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও পাকিস্তানের এই ভূমিকার ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছেন। রশিদ আলভি প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন ইসরায়েলকে 'পিতৃভূমি' হিসেবে গণ্য করেন, তখন তিনি শান্তি স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করবেন কীভাবে।
অন্যদিকে নিরুপমা মেনন রাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, পাকিস্তান এখানে একটি সংকীর্ণ কিন্তু কার্যকর কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে। তার মতে, ভারত এই মুহূর্তে নীরব থেকে নিজের অবস্থানকে দুর্বল করছে এবং দিল্লির উচিত নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে একাত্ম না হয়ে পরিমিত কণ্ঠস্বরে শান্তি ও নৌ-নিরাপত্তার কথা বলা।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও পরিণতি
বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন এই পরিস্থিতিকে ভারতের জন্য একটি বড় পরাজয় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, মোদি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু উল্টো ভারতকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তান বর্তমানে একমাত্র রাষ্ট্র যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইরান—সব পরাশক্তির সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
সাংবাদিক অঞ্জনা শঙ্কর এবং আরও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শেহবাজ শরিফ সরকার যে মধ্যস্থতা করতে সফল হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর ফলে দীর্ঘ সাত বছর পর ইরানের তেল ভারতে আসার সুযোগ তৈরি হলেও এর কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে ভারতের পরিবর্তে পাকিস্তানের নামই সামনে আসছে।
এই ঘটনা ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ভারতকে আরও সক্রিয় ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে বৈশ্বিক সংকটে তার ভূমিকা স্পষ্ট ও কার্যকর হয়।



