কূটনীতিতে চিঠির ঐতিহ্য: তারেক রহমানের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির সূচনা
কূটনীতিতে চিঠির ঐতিহ্য: তারেক রহমানের নতুন পথ

কূটনৈতিক সম্পর্কে চিঠির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান প্রয়োগ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক প্রচারণায় নানাবিধ উপায় গ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিগত সময়ে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানরা বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দকে আম, ইলিশ মাছ এবং জামদানি শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী উপহার প্রদান করেছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক পদ্ধতি এই প্রচলিত রীতি থেকে ভিন্নতর। তিনি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে কূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন, যা পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী উপহারের ধারা: আম থেকে ইলিশ পর্যন্ত

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের রাষ্ট্রপতি ধ্রুপদি মুরমু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সোনিয়া গান্ধীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি বছর আম ও মৌসুমি ফল উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। বিদেশি কূটনীতিকদের স্ত্রীদের জন্য বাংলাদেশি জামদানি শাড়ি প্রদানেরও রেওয়াজ ছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকেও আম পাঠানো হয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে কেনু ফল উপহার হিসেবে এসেছে।

ভারত থেকে রাখি বন্ধনের উপহার হিসেবে মিষ্টি, রাখি এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের বাঁধানো ছবি প্রেরণ করা হয়েছে। ত্রিপুরা থেকে আনারস এবং পদ্মার ইলিশ মাছও কূটনৈতিক উপহার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ভুটান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আম পাঠিয়েছেন, এমনকি ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে হাঁড়িভাঙা আম উপহার দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তারেক রহমানের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি ও চিঠির কূটনীতি

২০২৪ সালের ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ গ্রহণ করেন। প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তিনি পররাষ্ট্রনীতির নতুন দর্শন 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' ঘোষণা করেন, যেখানে দেশের মানুষের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই নীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, "পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, নন-ইন্টারফেরেন্স, কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, ন্যাশনাল ডিগনিটি, জাতীয় সম্মান-মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে আমরা পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড পরিচালনা করব।" তিনি মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির দিকে ফিরে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।

জিয়াউর রহমানের চিঠির ঐতিহ্য ও সার্ক প্রতিষ্ঠা

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কাছে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন। এই চিঠিতে তিনি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের তথ্য উল্লেখ করেন। ১৯৮০ সালের ২ মে তিনি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন, যা ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।

তারেক রহমানের চিঠি প্রেরণের বর্তমান উদ্যোগসমূহ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান এই চিঠি প্রেরণের রীতি পুনরুজ্জীবিত করেছেন:

  • ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি: গত ২০ মার্চ ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়, যাতে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব ও জনগণের সম্পর্ক শক্তিশালী করার আশা প্রকাশ করা হয়।
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রপ্রধানরা: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির বিশেষ দূত হিসেবে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কাছে সংহতি জানিয়ে চিঠি হস্তান্তর করেছেন।
  • জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখা হয়েছে।
  • অন্যান্য নেতৃবৃন্দ: ভারতের বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীনের এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা চিঠি আদান-প্রদানকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি আনুষ্ঠানিক ও কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, "এটাকে কূটনীতির এক ধরনের প্রক্রিয়া বলা যায়। এক দেশের সরকার আরেক দেশের সরকারকে চিঠি দেওয়ার রীতি আছে। এর বাইরেও কূটনীতিক আদান-প্রদানের মাধ্যম আছে, তবে এটাকে আমি ভালো উদ্যোগই বলবো।"

অন্য একজন সাবেক কূটনীতিক মন্তব্য করেন, "মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংহতি জানানো কূটনীতির অপরিহার্য অংশ। এতে কার জন্য কেমন সমর্থন, সহানুভূতি, সংহতি—তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিপুল সংখ্যক কর্মীর স্বার্থেও এই সংহতি জরুরি।" তিনি আরও যোগ করেন যে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে উপহার প্রদানের ঐতিহ্যবাহী রীতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির আলোকে চিঠি প্রেরণের এই নতুন ধারা দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত ও কৌশলগতভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।