পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পোস্টে 'ড্রাফট' লেবেল: হোয়াইট হাউসের ভূমিকা নিয়ে জল্পনা
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দেওয়া এক বিবৃতিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্স প্ল্যাটফর্মে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট শেয়ার করেন, যা দু'বার এডিট করা হয় এবং প্রথম প্রকাশের সময় পোস্টের শুরুতে 'ড্রাফট - পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা' লেখা ছিল। এই 'ড্রাফট' লেবেলটি নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে কৌতূহল ও সংশয় তৈরি হয়েছে, যার ফলে পোস্টটির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ড্রাফট লেবেলের পেছনের রহস্য
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিজে খসড়া তৈরির সময় এমন শব্দচয়ন ব্যবহার করার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার, তার মিডিয়া টিমের কেউ লিখলেও 'পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা' এভাবে উল্লেখ করা কতটা স্বাভাবিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ওই পোস্টের ড্রাফট তৈরিতে হোয়াইট হাউস সরাসরি জড়িত ছিল। তবে, সরাসরি জড়িত থাকার অর্থ এই নয় যে হোয়াইট হাউসই খসড়াটি লিখে দিয়েছিল, বরং এটি কূটনৈতিক সমন্বয়ের একটি অংশ হতে পারে।
পোস্টের বিষয়বস্তু ও পটভূমি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম শেষ হওয়ার কয়েকঘণ্টা আগে শেহবাজ শরিফ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে এক্সে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। এই পোস্টে বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের চেয়ে পেছনের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো অনেক বেশি সক্রিয় ছিল। ট্রাম্প ইরানের হাজার বছরের 'সভ্যতা ধ্বংসের' হুমকি দেওয়ার পর, যেকোনো ধরনের সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদকে চাপ দিচ্ছিল যেন তারা ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করায়। পাকিস্তানের গোপন যোগাযোগ সম্পর্কে জানেন এমন অন্তত পাঁচ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেলের দাম বাড়তে থাকায় ট্রাম্প উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং ইরানের দৃঢ় শাসনে তিনি বিস্মিত হচ্ছিলেন। ২১ মার্চ ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো 'ধ্বংস করে দেওয়ার' হুমকি দেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির জন্য উদগ্রীব ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ফলাফল
ট্রাম্পের আলটিমেটামের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় ফোনালাপ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ধারণা ছিল, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কোনো মুসলিম-প্রধান প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের কাছে গেলে তা গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেশি হবে। এরপর আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেন এবং শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের কথা জানিয়ে এক্সে পোস্ট দেন।
পোস্টে তিনি ট্রাম্পের কাছে কূটনৈতিক সময়সীমা দুই সপ্তাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানান এবং ট্রাম্পসহ তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের ট্যাগ করেন। তিনি এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের নিজস্ব উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করলেও পোস্টের উপরে ভুলবশত 'ড্রাফট - পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা' লেখাটি রয়ে যায়, যা সমালোচনার জন্ম দেয়।
প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে, অনেকেই এই মধ্যস্থতাকে 'যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত চিত্রনাট্য' হিসেবে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কোনো নিজস্ব অবস্থান নেই বলে অনেকে মন্তব্য করেন। তবে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ওই পোস্টটি লিখে দেননি। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান দূতাবাসও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের উদ্যোগ হোক কিংবা শেহবাজ শরিফের ব্যক্তিগত উদ্যোগ হোক—বিষয়টি সাময়িকভাবে কাজে দিয়েছে। ওই পোস্টের কয়েকঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। সংশয়ের মধ্যেই আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।



