মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কেন পাকিস্তানই মধ্যস্থতাকারী? ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আস্থার কারণ বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসলামাবাদে আস্থা রাখছে?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনা পরিচালনার জন্য শুরু থেকেই দেশটির ওপর আস্থা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রশ্নটি বারবার উঠে আসছে যে, কেন পাকিস্তানই এই দুই পরস্পরবিরোধী শক্তির আস্থাভাজন হতে পেরেছে?

নিরপেক্ষতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিল জাল

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের নিরপেক্ষ অবস্থান, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নত হওয়া সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ক্ষমতাই এর মূল কারণ। যে কোনো সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হতে হলে দুই পক্ষেরই আস্থা অর্জন করা জরুরি, আর পাকিস্তান সেটিই করতে সক্ষম হয়েছে।

আরবের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের কারণে ইরান তাদের প্রতি আর বিশ্বাস রাখে না। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কিছু দেশে হামলা চালিয়েছে, যা এই অঞ্চলের জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সীমান্ত সংলগ্নতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব

অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে এবং দেশ দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। এই সম্পর্কের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে।

মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে 'আমার প্রিয় ভাই' সম্বোধন করে তাদের 'অক্লান্ত পরিশ্রমের' জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফিলিস্তিন ইস্যু ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, যা ইরানের আস্থার একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

ইসলামাবাদ ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এ যোগ দিয়েছে, যা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আসিম মুনিরকে তার 'প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' হিসাবে অভিহিত করেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা নির্দেশ করে।

ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের গভীর যোগাযোগ থাকায় এই আলোচনায় পাকিস্তান বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। তবে পাকিস্তানের এই আগ্রহ কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থও এর মধ্যে জড়িত।

দেশটি তার অধিকাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায় এবং বহু পাকিস্তানি এই অঞ্চলের দেশগুলোতে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠান। যুদ্ধের ফলে এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় শাহবাজ সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ

পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে বিরোধ এবং ভারতের সঙ্গে উত্তপ্ত সম্পর্কের মধ্যেও ইরানের অস্থিরতা দেশটির জন্য মোটেও সুখকর নয়। দেশের ভেতরেও স্থিতিশীলতার সংকট বিদ্যমান ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

যদিও এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নড়বড়ে বলে বিবেচিত হচ্ছে। যদি আগামী শুক্রবারের আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উভয় পক্ষই ইসলামাবাদকে দায়ী করতে পারে এবং নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পাকিস্তান কঠিন ভারসাম্য সংকটে পড়বে।

সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এখনই এটিকে স্থায়ী সাফল্য বলা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের এই ভূমিকা দেশটির কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিলেও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।