হোয়াইট হাউসের গোপন বৈঠকে নেতানিয়াহুর উপস্থাপনায় ইরান হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প
২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় কালো একটি গাড়ি হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করে, যাতে ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সাংবাদিকদের দৃষ্টি এড়িয়ে তাঁকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। নেতানিয়াহু তখন ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর মাসব্যাপী চেষ্টার চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
সিচুয়েশন রুমে গোপন উপস্থাপনা
প্রথমে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওভাল অফিসের পাশের কেবিনেট রুমে জড়ো হন, পরে নেতানিয়াহু নিচের তলায় সিচুয়েশন রুমে যান। এই কক্ষটি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য খুব কমই ব্যবহৃত হয়। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য একটি অত্যন্ত গোপনীয় দলিল উপস্থাপনা করেন।
ট্রাম্প টেবিলের মাথায় তাঁর চেনা জায়গায় না বসে এক পাশে বসেন, দেয়ালের বড় পর্দার দিকে মুখ করে। নেতানিয়াহু বসেন অন্য পাশে, ট্রাম্পের বিপরীতে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর পেছনের পর্দায় দেখা যায় মোসাদের প্রধান দাভিদ বার্নিয়াসহ সামরিক কর্মকর্তাদের, যেন তিনি যুদ্ধকালীন নেতার মতো পরিবেষ্টিত।
ছোট পরিসরের বৈঠক ও উপদেষ্টাদের উপস্থিতি
তথ্য ফাঁস ঠেকাতে এই বৈঠকের পরিসর ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট রাখা হয়েছিল। ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার অন্য শীর্ষ সদস্যরা এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও জানতেন না, যিনি তখন আজারবাইজানে ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
নেতানিয়াহুর এক ঘণ্টার উপস্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে বড় সশস্ত্র সংঘাতের দিকে এগিয়ে দেয়। পরের কয়েক দিন ও সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের ভেতরে একের পর এক আলোচনা হয়, যার বিস্তারিত আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি। ট্রাম্প ইরানে হামলায় যোগ দেওয়ার আগে নিজের বিকল্প ও ঝুঁকি বিবেচনা করার সুযোগ পান।
বই 'রেজিম চেঞ্জ'-এর ভিত্তিতে বিবরণ
এই বিবরণ নেওয়া হয়েছে আসন্ন বই 'রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দি ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প'-এর জন্য করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। বইটি প্রশাসনের ভেতরের আলোচনা, ট্রাম্পের স্বভাবগত প্রবৃত্তি, তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ভাঙন ও হোয়াইট হাউস পরিচালনার পদ্ধতি তুলে ধরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নেওয়া বিস্তৃত সাক্ষাৎকারের ওপর দাঁড়িয়েছে এই বিবরণ।
প্রতিবেদনগুলো দেখায়, বহু মাস ধরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ভাবনার কীভাবে মিলমিশ হয়েছিল, এমনকি প্রেসিডেন্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাও বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। দুই নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমেরিকার রাজনীতির বাম ও ডান, দুই দিকেই তীব্র সমালোচনা ও সন্দেহ তৈরি করেছে।
নেতানিয়াহুর যুক্তি ও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন
নেতানিয়াহু তাঁর উপস্থাপনায় ইঙ্গিত দেন যে ইরানে শাসন পরিবর্তনের সুর্বণ সুযোগ এখনই, এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটাতে পারে। তিনি একটি ভিডিও দেখান, যাতে ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভিসহ সম্ভাব্য নতুন নেতাদের ছবি ছিল। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কয়েক সপ্তাহে ধ্বংস করা সম্ভব, এবং সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের কিছু অংশ 'প্রহসনমূলক' বলে উল্লেখ করা হয়। সিআইএর পরিচালক র্যাটক্লিফ ও রুবিও শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। জেনারেল কেইন বলেন, ইসরায়েলিরা সাধারণত বেশি বাড়িয়ে বলে এবং তাদের পরিকল্পনা সব সময় ভালোভাবে তৈরি করা থাকে না।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত অনুমোদন
ট্রাম্প নেতানিয়াহুর উপস্থাপনার ১ ও ২ নম্বর অংশে আগ্রহী ছিলেন, অর্থাৎ ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা ও সামরিক বাহিনী ভেঙে দেওয়া। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নতুন গোয়েন্দা তথ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি বৈঠকের সুযোগ আসে, যা হামলার সময়সূচি এগিয়ে দেয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে চূড়ান্ত বৈঠকে ট্রাম্প উপদেষ্টাদের মতামত শুনেন। ভ্যান্স যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও সমর্থন দেন, ওয়াইলস জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে এগোনোর কথা বলেন, রুবিও সীমিত লক্ষ্যের পক্ষে মত দেন। সবাই প্রেসিডেন্টের প্রবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করেন।
ট্রাম্প বলেন, 'আমার মনে হয়, আমাদের এটা করতে হবে।' তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি রোধের কথা উল্লেখ করেন। জেনারেল কেইনের অনুরোধে পরের দিন বিকেলে হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প 'অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত' নির্দেশ পাঠান, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের সূচনা করে।



