নেপালের তরুণদের রাজনৈতিক উত্থান: বাংলাদেশের তুলনায় একটি ভিন্ন গল্প
নেপালের রাজনীতিতে সম্প্রতি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যেখানে তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। এই ঘটনা কেবল প্রজন্ম পরিবর্তনের প্রতীকই নয়, বরং দেশটির পার্লামেন্টেও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের তরুণরা একসময় রাজপথ কাঁপিয়ে সরকারের পতন ঘটালেও তাদের আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেনি।
নেপালের সাফল্যের পথে কী ছিল?
নেপালে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নামক একটি মাত্র চার বছর বয়সী দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এই দলের সঙ্গে জোট করে সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় এসেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করেছে:
- সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ: নেপালের তরুণ নেতারা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়েছেন, যা তাদের আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দিয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদী সংগঠন: আরএসপির দেশব্যাপী বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক তরুণ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করেছে।
- জোট কৌশল: বালেন্দ্র শাহের মতো জনপ্রিয় নেতার সঙ্গে জোট করে আরএসপি বিতর্ক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে এবং ভোটারদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে।
ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিতাশা কাউল উল্লেখ করেন, "নেপালে প্রতিষ্ঠিত দলগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল, ফলে তরুণকেন্দ্রিক দলগুলো সুবিধা পেয়েছে।"
বাংলাদেশের তরুণ আন্দোলন কেন পিছিয়ে?
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন-জি প্রজন্মের ব্যাপক বিক্ষোভ সরকারের পতন ঘটালেও, আন্দোলন-পরবর্তী প্রথম জাতীয় নির্বাচনে তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। এনসিপি ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ছয়টি আসনে জিতেছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ কাজ করেছে:
- সংগঠনের অভাব: তরুণ কর্মী পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদবের মতে, "আন্দোলন গড়া আর নির্বাচনে জয় পাওয়া—দুটি ভিন্ন বিষয়।" অর্থ জোগাড় ও সংগঠন গড়ে তোলার সক্ষমতার অভাব এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- জোটের ভুল সিদ্ধান্ত: এনসিপির রক্ষণশীল দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্ত অনেক তরুণ সমর্থক, বিশেষ করে নারীদের দূরে ঠেলে দিয়েছে।
- সময়ের ব্যবধান: বাংলাদেশে আন্দোলন ও নির্বাচনের মধ্যে প্রায় এক বছর ছয় মাসের ব্যবধান আন্দোলনের গতিকে ম্লান করে দিয়েছে, যেখানে নেপালে এই সময় মাত্র ছয় মাস ছিল।
দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ঋষি গুপ্তা বলেন, "বাংলাদেশে রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে এনসিপি জেন-জি আন্দোলনের চেতনার চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছে।"
তরুণদের হতাশা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তরুণ আন্দোলনকারী উমামা ফাতেমা ব্যক্ত করেছেন তাঁর হতাশা: "নেপালের তরুণেরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, তা দেখে নিজের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ না হয়ে পারিনি।" তাঁর মতে, তরুণদের মধ্যে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের বিক্ষোভ জাতীয় আলোচনাকে বদলে দিয়েছে এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। নতুন বিএনপি সরকার একটি ৩১ দফা পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করেছে, যদিও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। এনসিপি নেতা রাহাত হোসেন মনে করেন, "যদি এনসিপি মানুষের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়ায়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারবে।"
নেপালের নতুন পার্লামেন্ট সদস্যরা তাদের সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন। পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব বলেন, "আমরা এখন রাজপথ থেকে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছি। আমাদের জায়গা বদলেছে, কিন্তু এজেন্ডা নয়।" উভয় দেশের তরুণরা পরিবর্তনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।



