বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: নতুন সরকারের সামনে জটিল চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: নতুন সরকারের সামনে জটিল চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে একটি জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সাম্য, ন্যায্যতা ও মর্যাদাপূর্ণ সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে কঠিন এবং জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের জন্য বিদ্যমান বাধাগুলো অতিক্রম করে সম্পর্কের নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আস্থার সংকট ও ঐতিহাসিক পটভূমি

গত এক দশকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ হতাশ ও অসন্তুষ্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকে স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, প্রতিকূলভাবে দখলকৃত ভূমির সমাধান এবং বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে একধরনের ন্যায্যতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সালিসের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

তবে ২০১৪ সালের নির্বাচন অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না বলে বিবেচিত হয়। ওই নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়াটা বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দিল্লির প্রতি আস্থায় যথেষ্ট ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো সুরাহা না করেই একপক্ষীয় স্বার্থে ট্রানজিট চুক্তি, বন্দর ব্যবহার এবং আদানি বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত চুক্তির মতো বিষয়গুলোতে ভারসাম্যহীনতা জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তোলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য

সরকারি পর্যায়ের অসম আচরণের বাইরে, আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্ত করা এবং বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভাজনের প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে।

ভারতীয় হোটেলে বাংলাদেশি পর্যটকদের বর্জন, সেখানকার হাসপাতালে বাংলাদেশের রোগীদের চিকিৎসা দিতে অনীহা এবং দোকানে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সেবা না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পুনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্টল ভাঙচুর এবং জাতীয় পতাকার অবমাননার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততা ছিল লক্ষণীয়। তবে এরপরও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা দুই দেশের অর্থনীতির পারস্পরিক সংযুক্ততা ও গভীরতা নির্দেশ করে।

গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক প্রভাব

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতার ভারতে অবস্থান। বিএনপি সরকারের প্রতি আওয়ামী লীগের বিষয়ে কিছুটা সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের যে অনুচ্চারিত প্রত্যাশা রয়েছে, তা সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে একটি ‘সংবেদনশীল’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০৭ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং পিলখানা বিদ্রোহে, যেখানে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, সেখানে আওয়ামী লীগ ও প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা জনমনে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করছে।

সহযোগিতার ক্ষেত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

নিরাপত্তা ও সীমান্তের অখণ্ডতা উভয় দেশের জন্যই অগ্রাধিকারের বিষয়। এ কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং জননিরাপত্তা ইস্যুতে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। মাদক পাচার, মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান সব দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া সক্রিয় করা অপরিহার্য।

অর্থনৈতিকভাবে দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল এবং একে অন্যের পরিপূরক। পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উভয় দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। মূল্য-শৃঙ্খল গঠন এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের চাহিদা পূরণ এবং তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অক্ষুণ্ন রাখা। জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কেন্দ্রে স্থান দেওয়া কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক। কৃষিপণ্য ও খাদ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি উপকরণ, বীজ ও সার সরবরাহ যেমন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে; তেমনি কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

রোহিঙ্গা ইস্যু ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা

আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় হলো রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান। মিয়ানমারের ‘ইসলামি সন্ত্রাস’ মতবাদ বা ন্যারেটিভ ভারতের গ্রহণ করাটা বাংলাদেশের কাছে দুর্বোধ্য। কারণ, ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের মুখ্য সময় তৎকালীন বার্মা ভারতের অংশ হিসেবে শাসিত হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে অভ্যুদয়ের তথ্য-উপাত্ত ভারতে সংরক্ষিত থাকার পরও এর রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান ব্যাখ্যা করা দুরূহ। বাংলাদেশ এই অবস্থানের পরিবর্তন আশা করে।

উপসংহার: সময়ের দাবি ও সুবর্ণ সুযোগ

বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে এবং প্রতিটি দেশ নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। এই পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুযোগ কাজে লাগানো এবং আস্থাহীনতার কারণগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দুর্বল থাকবে এবং মর্যাদাভিত্তিক সম্পর্কের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ, সম্মান আর মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক লাভ ও সৌহার্দ্যমণ্ডিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সুবর্ণ সুযোগ। আশা করা যায়, উভয় দেশ সাগ্রহে তার সদ্ব্যবহার করবে। দুই দেশের আলোচনায় রাষ্ট্রের, অর্থনীতির আর জনগণের স্বার্থের একটি ভারসাম্যসংবলিত এজেন্ডা গৃহীত হবে।