পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
দু'দিনের সরকারি সফরে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভারতের রাজধানী দিল্লি যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মরিশাসের পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে যোগদানের পূর্বে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সফর করছেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। কূটনৈতিক মহল এই সফরকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলানোর ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছে।
বৈঠক ও আলোচনার এজেন্ডা
এই সফরে ড. খলিলুর রহমান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সূত্রমতে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জ্বালানি সহায়তা, ভারতের পর্যটন ভিসা চালু, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যু। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।
সম্পর্ক উন্নয়নের প্রেক্ষাপট
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এই প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের সফর হতে যাচ্ছে এটি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে ভাটা পড়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ভারত ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। জানাজার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেন।
পরবর্তীতে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি তার প্রতিনিধি হিসেবে লোকসভার স্পিকারকে বাংলাদেশে পাঠান। ওই সময় নতুন সরকারকে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা সম্বলিত চিঠি পাঠানো হয়, যাতে সুবিধাজনক সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পরিবারসহ ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
কূটনৈতিক মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী ভারত। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও একই বার্তা জানান তিনি। প্রণয় ভার্মা বলেন, "ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সম্পর্ক জোরদার এবং সাংস্কৃতিক ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভৌগোলিক নৈকট্যকে নতুন সুযোগে রূপান্তরিত করতে হবে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "আমরা ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাচ্ছি। ভারতও তাই চায়। সেই সম্পর্ক কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সেটার একটা রূপরেখা এই সফর থেকে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
সফরের সময়সূচি ও পরিকল্পনা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ এপ্রিল বেলা ৩টার দিকে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সফরের প্রথম দিন সন্ধ্যায় তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পরদিন ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে।
সফর শেষে ৯ এপ্রিল পোর্ট লুইসের উদ্দেশে রওনা দেবেন ড. খলিলুর। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে যোগ দিতে একই ফ্লাইটে রওনা হবেন জয়শঙ্কর এবং খলিলুর। প্রায় ১০ ঘণ্টার ফ্লাইটে তারা দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয়ে নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপদেষ্টার বক্তব্য
পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এই সফরকে "শুভেচ্ছা সফর" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, "তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, দু'দেশ চাইলে সম্পর্কোন্নয়ন সম্ভব। আমি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছি। এটি কোনও বিশেষ সফর নয়। আমরা মরিশাস যাচ্ছি ইন্ডিয়ান ওশান সামিটে যোগ দিতে। পথে ভারতের সঙ্গে কেবল একটি শুভেচ্ছা সফর হবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "যেহেতু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের প্রয়াত নেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় এসেছিলেন এবং তাদের লোকসভার স্পিকারও উপস্থিত ছিলেন, তাই আমরা এই সৌজন্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা একটি শুভেচ্ছাসুলভ আচরণ দেখাচ্ছি। ভবিষ্যতে কীভাবে সম্পর্কোন্নয়ন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এ সফর।"
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর হবে।



