পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগামীকাল ৭ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে যাচ্ছেন। এই সফরটি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের অবস্থান স্পষ্টভাবে বুঝতে চাইবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক মর্যাদা ও আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেবে।
সফরের সময়সূচি ও বৈঠকের বিবরণ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৭ এপ্রিল বিকেলে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন এবং ৯ এপ্রিল দুপুরে মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দিতে রওনা হবেন। দিল্লিতে তাঁর সফরসঙ্গী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফর করছেন।
দিল্লি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে আলোচনা করবেন। ৮ এপ্রিল তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। এছাড়াও তিনি ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আলোচনা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, "ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে যাচ্ছি। দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।"
বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরটি হবে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বিবর্তনের পথরেখা নির্ধারণে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের ভূমিকা ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিল্লির সঙ্গে একটি ভালো ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় ঢাকা। এই সম্পর্ক যেন কারও চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সেই বার্তাই দেওয়া হবে এই সফরে। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে:
- বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব শ্রেণির ভিসা পুরোদমে চালু করা
- বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা
- জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা
- গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে সহযোগিতা বাড়ানো
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভারত কর্তৃক আরোপিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল মনে করে, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে ভারতের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ইস্যুগুলোর সমাধান জরুরি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে "ঢাকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ" বলে মন্তব্য করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দিল্লিও যদি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নে তা সহায়ক হতে পারে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিএনপির নেতৃত্ব শুধু বদলায়নি, দিল্লির প্রতি দলটির দৃষ্টিভঙ্গিও এখন আরও সংবেদনশীল ও ইতিবাচক। ভারত এবার প্রথমবারের মতো এমন একটি বিএনপিকে পাচ্ছে, যারা দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল মনে করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের যে সমীকরণ ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বাস্তবতা মেনে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে হবে। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী তিক্ততার অধ্যায় পেরিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগগুলো চিহ্নিত করাই এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দুই দেশের আলোচনায় সব ধরনের ভারতীয় ভিসা পুরোদমে চালু, বাণিজ্যের পথ সুগম, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে সহযোগিতা ও সীমান্তে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



