সীমিত আয়েও সুখী থাকার রহস্য: বরকতের গুরুত্ব ও উপায়
সীমিত আয়েও সুখী থাকার রহস্য: বরকতের গুরুত্ব ও উপায়

জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায়। ছবি: সংগৃহীত

অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয় সীমিত; তবুও তাদের সংসারে প্রশান্তি, তৃপ্তি ও সুখের কমতি নেই। আবার কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও অশান্তি, উদ্বেগ ও অপূর্ণতায় ভোগেন। এই দুই অবস্থার পার্থক্যের নামই হলো ‘বরকত’। ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা অল্পকে অনেক এবং সীমিতকে অর্থবহ করে তোলে। সময়, সম্পদ, জ্ঞান, পরিবার কিংবা স্বাস্থ্যে যখন বরকত আসে, তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে শান্তিময় ও পরিপূর্ণ। তাই একজন মুমিনের জন্য বরকতের প্রকৃত অর্থ জানা এবং তা অর্জনের পথ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরকত কী?

মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিদিনের কথাবার্তা, দোয়া এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘বরকত’ শব্দটি ব্যবহার করি। সালামের জবাবে বলি—السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ ‘আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।’ ঈদের দিনে বলি ‘ঈদ মোবারক’। নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্যও সুন্নত অনুযায়ী বরকতের দোয়া করা হয়। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদদের মতে, ‘বরকত’ শব্দের অর্থ স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা, বৃদ্ধি, প্রাচুর্য এবং কল্যাণের ধারাবাহিকতা। সহজ ভাষায়, কোনো কাজে যখন আল্লাহর বরকত থাকে, তখন সামান্য প্রচেষ্টা থেকেও আশাতীত ফল লাভ করা যায়। বরকতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো— কল্যাণের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তি নয়, সেই প্রাপ্তির স্থায়িত্ব ও উপকারিতাও বরকতের অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে বরকত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা মানুষের জীবনকে কল্যাণময়, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফলে পরিপূর্ণ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বরকতের গুরুত্ব এত বেশি কেন?

পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে ‘বরকত’ শব্দ ও তার বিভিন্ন রূপ এসেছে। মহান আল্লাহ নিজেই কুরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَهَٰذَا كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ ‘এটি এমন এক কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি; এটি অত্যন্ত বরকতময়।’ (সুরা আল-আন‘আম: আয়াত ৯২) হাদিসে বরকতের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللّٰهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে।’ এরপর তিনি বলেন—لَا أَقُولُ الم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ ‘আমি বলছি না যে ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর।’ (তিরমিজি ২৯১০) এই হাদিস প্রমাণ করে, আল্লাহর বরকত থাকলে সামান্য আমলও বহুগুণ ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে।

কেন জীবনে বরকত কমে যায়?

অনেক সময় মানুষ সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা ও বাহ্যিক সফলতা অর্জন করেও অন্তরে শান্তি খুঁজে পায় না। আবার সীমিত আয় ও সাধারণ জীবনযাপন করেও কেউ সুখী ও তৃপ্ত থাকেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো বরকতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা, গুনাহ, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষের জীবন থেকে বরকত কমিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে কৃতজ্ঞতা, ইবাদত, সততা ও উত্তম চরিত্র বরকত বৃদ্ধির কারণ হয়।

জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায়

১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া

বরকত লাভের প্রথম শর্ত হলো কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাআলা বলেন—لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৭) কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।

২. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা

প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্য নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ে বরকতের জন্য দোয়া করা প্রয়োজন— সময়ের বরকত, সম্পদের বরকত, স্বাস্থ্যের বরকত। সময়ের বরকত কর্মদক্ষতা বাড়ায়, সম্পদের বরকত অভাব দূর করে এবং স্বাস্থ্যের বরকত মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী রাখে।

৩. নামাজকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তোলা

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে দিনের পরিকল্পনা সাজালে জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মিক প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ৪৫) নামাজ শুধু ইবাদত নয়; বরং এটি বরকতময় জীবন গঠনের অন্যতম ভিত্তি।

৪. আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা

পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বরকতের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ুতে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি ৫৯৮৬, মুসলিম ২৫৫৭) সুসম্পর্ক, সততা এবং উত্তম আচরণ মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত ও বরকত নিয়ে আসে।

বরকত এমন একটি নেয়ামত, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে লাভ করা যায়। জীবনে বরকত থাকলে অল্প সম্পদেও সুখ থাকে, সীমিত সময়েও কাজ সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। তাই আমাদের উচিত কৃতজ্ঞতা, নামাজ, দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত অর্জনের চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত সফলতা শুধু বেশি পাওয়া নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সামান্য নিয়ামতের মধ্যেও অসীম কল্যাণ খুঁজে পাওয়ার নামই বরকত।