নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর শপথগ্রহণ
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো শুক্রবার। কাঠমান্ডুর প্রেসিডেন্ট ভবন শীতল নিবাসে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করালেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) নেতা বালেন্দ্র শাহ। প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি ছিল আড়ম্বরপূর্ণ ও ঐতিহাসিক।
ইতিহাস সৃষ্টিকারী প্রধানমন্ত্রী
বালেন্দ্র শাহ নেপালের ইতিহাসে প্রথম মাধেসি সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তাঁর এই পদলাভ দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির নতুন বার্তা বহন করে আনছে। পেশায় একজন র্যাপার ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন্দ্র শাহ প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক উত্থানের পথ
বালেন্দ্র শাহর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালে, যখন তিনি কাঠমান্ডু সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর প্রার্থীদের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি তখনই রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করার পর তিনি আরএসপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
গত ৫ মার্চের সংসদীয় নির্বাচনে ঝাপা-৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বালেন্দ্র শাহ আরেকটি বড় সাফল্য অর্জন করেন। এই নির্বাচনে তিনি নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করে নিজের রাজনৈতিক শক্তি প্রমাণ করেন। ওলির নিজের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে জয়লাভ বালেন্দ্র শাহর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
নতুন মন্ত্রিসভার গঠন
বালেন্দ্র শাহর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল আরও ১৪ জন মন্ত্রীকে শপথবাক্য পাঠ করান। নতুন এই মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে:
- অর্থ মন্ত্রণালয়: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও আরএসপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. স্বর্নিম ওয়াগলে
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: জেন-জি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসা সুদান গুরুং
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: শিশির কানাল
- সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল: খড়কা রাজ (গণেশ) পৌডেল
- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: দীপক সাহ
এছাড়াও শিক্ষা ও ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছেন শস্মিত পোখরেল। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিক্রম তিমিলসিনা। কেন্দ্রীয় ও ভূমি ব্যবস্থাপনামন্ত্রী হয়েছেন সাবেক সাংবাদিক প্রতিভা রাওয়াল। শক্তি ও সেচমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ।
কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন গীতা চৌধুরী। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হয়েছেন সবিতা গৌতম। সিতা বদি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। সুনীল লামসালকে গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিশা মেহতা পেয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
নতুন যুগের সূচনা
বালেন্দ্র শাহর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। মাধেসি সম্প্রদায়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নেপালের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বালেন্দ্র শাহর এই উত্থান একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তাঁর পেশাগত পটভূমি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নেপালের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



