নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তা
গত বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে, নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত ৫৬তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিংয়ের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই মিলনমেলায় দুই দেশের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান স্মরণ
হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ তাঁর স্বাগত ভাষণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের সমর্থন এবং ১ হাজার ৬৬৮ জন ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে।
"এই আত্মত্যাগ ও অবদান ভোলার নয়," বলেন হামিদুল্লাহ। তিনি মেজর জিয়াউর রহমানকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যিনি জনগণের পক্ষ থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন
অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার হামিদুল্লাহ বাংলাদেশ ও ভারতের অনন্য ও বহুমুখী সম্পর্কের অংশীদারত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি দুই দেশের কৃষি, বয়নশিল্প, কারুশিল্প, কবিতা, সংগীত ও শিল্পকলার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন বোস, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো ব্যক্তিত্বদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই সাংস্কৃতিক বন্ধন দুই দেশের গভীর মানবিক সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে।
হামিদুল্লাহ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, রবিশঙ্করের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববাসীর দৃষ্টি পূর্ব পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। "এই সবকিছুই আমাদের গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতিচ্ছবি," তিনি বলেন।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ককে গভীরতর করার জন্য ভারতের আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "বহুমুখী সম্পর্কের প্রসার ঘটাতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারতও আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছে।"
হাইকমিশনার হামিদুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির উল্লেখ করে বলেন যে, ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, বাস্তব পরিস্থিতি ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২৮-৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও অতিথিবৃন্দ
হাইকমিশন ও সংলগ্ন বাসভবন চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছিল, যেখানে রেড কার্পেট ও আলোর মালায় সজ্জিত গাছগাছালি অতিথিদের স্বাগত জানায়। অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের তিন সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখোপাধ্যায়, পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী ও রীভা গাঙ্গুলি দাশসহ বহু সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত ‘কাচ্চি বিরায়ানি’, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাটারিং বিভাগ দ্বারা পরিবেশন করা হয়েছিল। সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের কণ্ঠশিল্পী আয়েশা মৌসুমি ও জাহিদ নীরব। বিশিষ্ট রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ আশিস নন্দী উপস্থিত থেকে মন্তব্য করেন যে, "সম্পর্ক ধীরগতিতে এগোচ্ছে, যা পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়।"



