টোকিওতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন: অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও জাপানের সাথে সম্পর্কের গভীরতা
যথাযথ ভাব-গাম্ভীর্য এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর শহীদ, সম্ভ্রম হারানো মা-বোন ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি ও অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিবের (প্রেস) সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়। দিবসের প্রথমার্ধে দূতাবাস প্রাঙ্গণে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করেন। এরপর চ্যান্সারি মিলনায়তনে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা ও বাণী পাঠ
অনুষ্ঠানে দিবসটি উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া বাণীগুলো পাঠ করা হয়। এরপর ২৬ মার্চের ওপর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর কর্তৃক তৈরি করা বিশেষ ডকুমেন্টরি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে এক বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় ভাগের আয়োজন ও রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
দিবসের দ্বিতীয় ভাগে টোকিওর ঐতিহ্যবাহী হোটেল নিউ ওতানি-র ‘হো হল’-এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কুনিমিতসু আয়ানো। স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। আমাদের নবনির্বাচিত সরকার নতুন উদ্যম, ধারাবাহিক নীতি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বদ্ধপরিকর।”
তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৩৪তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহুমুখিতা তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে জাপানের শ্রমবাজারে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টির জন্য আমি জাপান সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বিশেষ করে, জাপান সরকারের বিভিন্ন প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের জাপানে কর্মসংস্থানের এই উদ্যোগ আমাদের দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।”
বিনিয়োগের আহ্বান ও ইপিএ চুক্তির গুরুত্ব
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য আদর্শ স্থানে পরিণত হয়েছে।” তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের আইটি, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং উৎপাদনশীল খাতসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় শিল্পে বিনিয়োগের জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানান এবং বিনিয়োগ সুরক্ষায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রদূত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২০২৬ সালের শুরুতে স্বাক্ষরিত ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
জাপানের প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ও সম্পর্কের গভীরতা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কুনিমিতসু আয়ানো বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “জাপান বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়াকে স্বাগত জানায়। আমরা নবগঠিত সরকারের সাথে আমাদের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ আরও সুদৃঢ় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে। জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে এই সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনে ধারাবাহিকভাবে পাশে আছে।”
দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ইতিহাসের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি গভীর বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের এই সুসম্পর্ক এখন কেবল উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে শুরু করে জনগণের মেলবন্ধন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।” আগামী দিনে এই বন্ধুত্ব আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পার্লামেন্টারি বার্তা ও অতিথিদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের (জেবিপিএফএল) প্রেসিডেন্ট তারো আসো-র একটি লিখিত বিশেষ বার্তা পাঠ করা হয়। বার্তায় তিনি বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে জাপানের অবিচল সমর্থনের আশ্বাস দেন।
সন্ধ্যায় এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাপানের প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী, জাপান পার্লামেন্টের সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি এবং জাপানের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাপানে বসবাসরত সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খাবার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে উপভোগ করেন।



