ইইউর শীর্ষ কূটনীতিকের অভিযোগ: 'যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়'
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার সঙ্গে ১৩ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা ইউরোপজুড়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। কালাস উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও বর্তমান সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
মার্কিন নীতির সমালোচনা ও ইউরোপীয় ঐক্যের হুমকি
কাজা কালাস গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশল নথির উল্লেখ করে বলেন, সেখানে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পছন্দ করে না এবং বিভক্ত করতে চায়। তিনি মন্তব্য করেন, 'ওয়াশিংটনের এই আচরণ আমাদের প্রতিপক্ষদের কৌশলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।' এই বক্তব্য ইউরোপীয় রাজনীতিতে মার্কিনবিরোধী প্রকাশ্য সমালোচনার একটি নতুন ধারা নির্দেশ করে, যা আগে বিরল ছিল।
ইরান যুদ্ধে ইউরোপের অনুপস্থিতি ও সম্পর্কের পরিবর্তন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধে ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম বড় সংঘাত যেখানে ইউরোপ বাইরে রয়েছে। পূর্বের যুদ্ধগুলো যেমন আফগানিস্তান, ইরাক বা ইসলামিক স্টেট বিরোধী জোটে ইউরোপীয় দেশগুলো ন্যাটোর নেতৃত্বে বা পৃথকভাবে জড়িত ছিল। কিন্তু এবার ইইউর সম্মতি না থাকায় যুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি। ব্রিটেনও প্রথমে মার্কিন হামলার জন্য সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল, যা বিশেষ সম্পর্কের ঐতিহ্যবাহী ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ ও ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিন-ইউরোপ সম্পর্ক ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। জার্মানির ডের স্পিগেল পত্রিকা রিপোর্ট করে, ট্রাম্প শুল্ক আরোপ, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া, মার্কিন প্রশাসন ইইউ ও অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে, যা নতুন শুল্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেমস ডেভিড ভ্যান্সের ইউরোপীয় গণতন্ত্রের সমালোচনামূলক ভাষণও উত্তেজনা বাড়ায়।
ইউরোপের আত্মনির্ভরশীলতার দিকে যাত্রা
ইউরোপীয় নেতারা এখন মার্কিন নির্ভরতা কমানোর দিকে মনোনিবেশ করছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন, যা আত্মনির্ভরশীলতার ইঙ্গিত দেয়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন ইইউ চুক্তির ৪২(৭) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে জানান, সশস্ত্র সংঘাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরকে সহায়তা করবে, যেমন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের দাবির প্রেক্ষিতে ডেনমার্ককে সমর্থন। কাজা কালাসও প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নিজস্ব শিল্পে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সামগ্রিকভাবে, 'যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে বিভক্ত করতে চায়'—এই ধারণা ইউরোপীয় জনমনে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং কূটনীতিকদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যত সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
