মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সৌদি আরবকে 'প্রয়োজনমতো' সহায়তা দেবে পাকিস্তান
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা সৌদি আরবকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
মুখপাত্রের স্পষ্ট ঘোষণা
ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশি গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র মোহসাররফ জাইদি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'যে কোনো পরিস্থিতিতে এবং যখনই প্রয়োজন হবে, ইসলামাবাদ রিয়াদের পাশে দাঁড়াবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।' তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংঘাতের পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার মধ্যে সৌদি আরবও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তবুও তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে যে যেসব স্থান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হবে, সেসব স্থানই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই চুক্তির আলোকেই পাকিস্তানের বর্তমান ঘোষণা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ ইরানকে সৌদি আরবের ওপর হামলা বন্ধ করতে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে সামরিক নেতৃত্ব ইরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার জানিয়েছেন, ইরান বলেছে—যদি সৌদি আরব নিশ্চয়তা দেয় যে তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না, তাহলে তেহরানও সৌদি আরবের ওপর হামলা করবে না।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা
পাকিস্তান–সৌদি সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মোহসাররফ জাইদি বলেন, ইসলামাবাদ ও রিয়াদ সব সময়ই 'একজন আরেকজনের পাশে থাকার নীতি' অনুসরণ করেছে। তিনি আরও জানান, সংঘাত শুরুর পর থেকেই সৌদি আরব পাকিস্তানের তেল ও ডিজেল সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের নতুন পথ
সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান এখন লোহিত সাগর হয়ে তেল আমদানি শুরু করেছে। পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের একটি জাহাজ সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে ৭৩ হাজার টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে বৃহস্পতিবার করাচির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। আরেকটি জাহাজ 'শালামার' ফুজাইরাহ বন্দর থেকে তেল নিয়ে ইতোমধ্যে করাচির পথে রয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালিতে চলমান উত্তেজনার কারণে কয়েকটি জাহাজ চলাচলে সমস্যায় পড়েছে এবং পাকিস্তানের দুটি জাহাজ বর্তমানে করাচি উপকূল ও একটি চার্টার বন্দরের কাছে আটকে রয়েছে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ
এর আগে পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সৌদি আরব সফর করে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোকে ইরানের হামলার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, এর একদিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান, যা আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
