বাংলাদেশ-ফিলিপাইন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা: নার্সিং সহযোগিতা চুক্তি আসন্ন
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত নিনা প্যাডিলা কেইনলেট মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গতিশীল ও জোরদার করার জন্য একাধিক নতুন সমঝোতা ও সহযোগিতা চুক্তি সই করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
নার্সিং ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সমঝোতাপত্র সই হবে শিগগির
সাক্ষাতের শুরুতে রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীকে তার দায়িত্ব গ্রহণে অভিনন্দন জানান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারকে ফিলিপাইন সরকারের পক্ষ থেকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, নতুন নেতৃত্বের অধীনে দু’দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। প্রতিমন্ত্রী ফিলিপাইনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রদূত নিনা প্যাডিলা কেইনলেট জানান, নার্সিং সহযোগিতার জন্য শিগগরই একটি সমঝোতাপত্র সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া দুই দেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজগুলোর মধ্যে শ্রম সহযোগিতার জন্য দুটি অতিরিক্ত সমঝোতাপত্র সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সহযোগিতা চুক্তি সইয়ের জন্য ফিলিপাইনের কৃষিমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সহযোগিতা
ফিলিপাইনের কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (টেসডা) সঙ্গে সহযোগিতাসহ উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যাগত প্রোফাইল ফিলিপাইনে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, যত্ন প্রদান, আইসিটি এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে।
শান্তি প্রক্রিয়া ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান
রাষ্ট্রদূত ১৯৯৬ সালের শান্তি চুক্তির পরে ফিলিপাইনের ভূমিকাসহ ফিলিপাইনে শান্তি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী সমর্থনের প্রশংসা করেন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা স্বীকার করেন। প্রতিমন্ত্রী ফিলিপাইনকে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সম্ভাবনা
আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। প্রতিমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ থেকে ওষুধ, পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং তৈরি পোশাক রফতানিসহ বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে ফিলিপাইনের বিনিয়োগের পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ ও ব্যবসায়িক বিনিময়ের সুযোগের কথা উল্লেখ করেন।
উভয়পক্ষই বিমান পরিষেবা, দুর্নীতিবিরোধী সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সংক্রান্ত সমঝোতাপত্র সহ মুলতবি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করেছে এবং দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫তম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে আগামী বছর পররাষ্ট্র দফতরের পরবর্তী কন্সাল্টেশন সভা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সৃজনশীল অর্থনীতি ও যুব বিনিময়ে সহযোগিতা
উভয়পক্ষ সৃজনশীল অর্থনীতি, গেমিং শিল্প, যুব বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সহ উদীয়মান ক্ষেত্রে সহযোগিতার পাশাপাশি যৌথ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছে। প্রতিমন্ত্রী আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় ফিলিপাইনের সমর্থন কামনা করেন।
আইনি সহযোগিতা ও নাগরিক সুরক্ষা
প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির বিষয়টিও উত্থাপন করেন এবং আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ফিলিপাইন সরকারের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি ফিলিপাইনে বাংলাদেশি নাগরিকদের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাদের মামলাগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিষ্পত্তি করার অনুরোধ জানান।
উভয় পক্ষ বাংলাদেশ-ফিলিপাইন সম্পর্কের ইতিবাচক গতিপথে সন্তোষ প্রকাশ করে এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। এই সাক্ষাৎ দুই দেশের মধ্যে বহুমুখী সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
