ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যাকাণ্ডে ভারতের নীরবতা: নৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্ন
খামেনি হত্যাকাণ্ডে ভারতের নীরবতা: নৈতিক প্রশ্ন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি হত্যাকাণ্ডে ভারতের নীরবতা: নৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্ন

১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে তেহরান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি হোসেইনি খামেনি লক্ষ্যভেদী হামলায় নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আঘাতের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ঘটে। এই ঘটনা কেবল একটি দেশের শোকের বিষয় নয়, বরং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ফাটলরেখা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

ভারত সরকারের নীরবতা ও নীতিগত দ্বিধা

এই হত্যাকাণ্ডের পর ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়ভাবে নীরব রয়েছে। সরকার এই ঘটনার নিন্দা জানায়নি বা ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সরব হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার প্রসঙ্গ এড়িয়ে কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের পাল্টা আঘাতের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন। পরে তিনি ‘গভীর উদ্বেগ’ ও ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন, কিন্তু যে সংলাপ চলছিল তার মধ্যেই এই হামলা ঘটানো হয়েছে।

বিদেশি এক রাষ্ট্রপ্রধানের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার ঘটনায় যদি ভারত সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়? এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং এই হত্যাকাণ্ড সেই নীতির কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে।

ইসরায়েল সফর ও সমর্থনের প্রেক্ষাপট

হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরায়েল সফর শেষে দেশে ফিরেছেন, যেখানে তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই সময়ে গাজায় চলমান সংঘাতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ, বিশেষত নারী ও শিশু, নিহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। গ্লোবাল সাউথের বহু দেশ, এমনকি ভারতের ব্রিকস অংশীদার রাশিয়া ও চীন ইসরায়েলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে, কিন্তু ভারতের এই হাই-প্রোফাইল সমর্থন নৈতিক স্বচ্ছতা ছাড়াই প্রদর্শিত হচ্ছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগরে শিয়া মুসলমানরা বিক্ষোভ করেন, যেখানে নিরাপত্তা কর্মীরা গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করেন। প্রশাসন এই প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা ঘটনাটির অভিঘাত ভূরাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত করে।

বিরোধী দলের অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস স্পষ্ট ভাষায় ইরানের মাটিতে বোমাবর্ষণ ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলার বিপজ্জনক পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিতে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু বর্তমান নীরবতা এই ঘোষিত নীতির সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল কৌশলগত নয়, সভ্যতাগতও। ১৯৯৪ সালে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)-এর একাংশ যখন কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেয়, তেহরান সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। পাশাপাশি, গওয়াদার বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের পাল্টা ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন জাহেদানে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি ইরানের সহযোগিতাতেই সম্ভব হয়েছে।

কৌশলগত প্রয়োজন ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, কৃষি ও প্রযুক্তিতে বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু তেহরান ও তেল আবিব উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যেই ভারতের কূটনৈতিক শক্তি নিহিত। সংযমের আহ্বান জানানোর বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে নীতির ভিত্তিতে, সুবিধাবাদের নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কর্মরত, এবং অতীতের সংকটে ভারত তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পেরেছে স্বাধীন নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে।

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এবং ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ‘বিশ্ব এক পরিবার’ আদর্শের কথা বলে এসেছে। আজ প্রশ্ন উঠছে—সেই অবস্থান কি শিথিল হচ্ছে? শক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের মুখে নীরবতা সেই ঐতিহ্য থেকে সরে আসার লক্ষণ। ভারত নিজেকে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন যদি বিনা প্রতিক্রিয়ায় মেনে নেওয়া হয় তবে ক্ষুদ্র শক্তিগুলো শক্তিধরদের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়ে।

পার্লামেন্ট পুনরায় বসলে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভাঙন নিয়ে এই নীরবতা খোলামেলা বিতর্কে আসা উচিত। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে টার্গেট করে হত্যা করা, আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষয়, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা—এসব ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ও নৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও কৌশলগত স্বচ্ছতা—দুটিই ভারত চায়, এবং এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।