মোদির ইসরায়েল সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনা
মোদির ইসরায়েল সফর: এআই ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা

মোদির ইসরায়েল সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার দুই দিনের সরকারি সফরে ইসরায়েল পৌঁছেছেন। তেল আবিবের কাছে লোদ এলাকার বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনে ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই সফর ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার একটি সূবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

৯ বছর পর আবারও একসঙ্গে দুই নেতা

প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফরে গিয়েছিলেন। তখনও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ছিলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রায় নয় বছর পর আজও দুই দেশের ক্ষমতায় একই নেতারা অবস্থান করছেন। একে অপরকে ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবে সম্বোধন করা মোদি ও নেতানিয়াহু এবারের সফরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। ইসরায়েল বর্তমানে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে, যা এই আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হতে পারে।

সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ও প্রত্যাশা

ইসরায়েল সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোদির এই সফর দুই দেশের মধ্যে নতুন অংশীদারত্বের পথ প্রশস্ত করবে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে। সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেওয়া এবং হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধ ‘ইয়াদ ভাশেম’-এ শ্রদ্ধা নিবেদন করা।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপট

মোদির ইসরায়েল সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। ইতিমধ্যে আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া আরেকটি রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ বর্তমানে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থান করছে, যা যেকোনো সময় ইরানের উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

বর্তমান উত্তেজনার শুরু থেকেই তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যেকোনো হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত আকারের হামলাকেও ‘আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে পুনরায় শুরু হওয়া এই আলোচনাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ভারতের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কৌশল

আক্রান্ত হলে ইসরায়েলের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। এসব আরব দেশে ভারতের লাখ লাখ নাগরিক কর্মরত আছেন। এই অঞ্চল থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে ভারতে। ভারতের চিন্তক সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কবির তানেজা বলেন, নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে কোনো সংঘাত চায় না। অতীতে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে এবং মোদির এই সফরেও তা পুনর্ব্যক্ত করা হবে।

নেতানিয়াহু চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ভারতকে ‘ভবিষ্যতের অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, উগ্রপন্থী শক্তির মোকাবিলায় সমমনা দেশগুলোর এক হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে কবির তানেজা উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহী হলেও ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক জোটে যোগ দিতে দ্বিধা করবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বিষয়ে জোটনিরপেক্ষ থাকার দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে নয়াদিল্লির।