মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন কূটনীতির দ্বিমুখী রূপ
গত বছরের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য নাটকীয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এবারের সম্মেলনে মার্কিন প্রতিনিধিদলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ এ. কলবি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির দুই ভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কলবির সরাসরি চ্যালেঞ্জ ও শক থেরাপি
কলবি, যিনি মার্কিন সেনা মোতায়েনের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁর বক্তব্যে ইউরোপকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, 'ইউরোপ ও আমেরিকার আর কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ নেই' এবং 'রুলস-বেজড অর্ডার' শব্দবন্ধটি সম্মেলনে মাত্র দুবার উচ্চারিত হয়েছে। কলবির মতে, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বজায় রাখলেও ইউরোপকে নিজ মহাদেশের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে হবে। তিনি জার্মানি ও পোল্যান্ডের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রশংসা করেন এবং ইউক্রেন, গ্রিনল্যান্ডসহ ট্রান্স-আটলান্টিক উত্তেজনার উৎসগুলো উল্লেখ করেন। তাঁর যুক্তি, 'একটা নির্দিষ্ট মাত্রার উদ্বেগ উপকারী'—যা ইউরোপকে স্বনির্ভর হতে প্রণোদিত করবে।
রুবিওর মধুর আহ্বান ও অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত
অন্যদিকে, মার্কো রুবিও তাঁর বক্তব্যে ইউরোপ ও আমেরিকার ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত বন্ধনের প্রশস্তি গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমেরিকা 'সব সময় ইউরোপের সন্তান' হয়ে থাকবে এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক 'রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গভীর বন্ধনের প্রতিফলন'। রুবিও ক্রিস্টোফার কলম্বাস, স্কটস-আইরিশ বসতকারী, খ্রিষ্টধর্ম এমনকি জার্মান বিয়ারের মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করে পশ্চিমা ঐতিহ্যের কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতারা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান এবং ইউরোপীয় নেতারাও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর বার্তা ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য কলবির চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক। কারণ, রুবিও যে ইউরোপের প্রশংসা করেন, তা বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়; বরং জাতিগত ও জাতীয়তাবাদী ইউরোপ, যা উত্থানশীল কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর স্বপ্নের প্রতিফলন। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তাকৌশল অনুযায়ী, এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তিগুলোই মার্কিন সমর্থন পেতে পারে। অর্থাৎ, রুবিও ইউরোপের বর্তমান সরকারের পরিবর্তে ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপকে এগিয়ে দেখছেন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বিশ্লেষণ
কলবি ও রুবিও দুজনেই ট্রাম্পের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে পরিচিত। তাঁরা প্রেসিডেন্টের সহজাত নীতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভার ও সুসংহত রূপ দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের পরও রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁদের প্রভাব বজায় থাকবে, বিশেষত রুবিওর, যার প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কলবি ইউরোপকে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার সমাপ্তি মেনে নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, '৩৪ কোটি আমেরিকান চিরকাল ৫০ কোটি ইউরোপীয়র নিরাপত্তার ভার বহন করবে না'। তবে তিনি পরিণত ও স্বনির্ভর ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে রাখার কথা বলেন।
রুবিওর বার্তার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত আরও অশুভ—তিনি এক নতুন 'সভ্যতাগত আটলান্টিকতাবাদ'-এর কল্পনা করছেন, যেখানে ইউরোপীয় সরকারগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি মার্কিন সম্মান নির্ভর করবে তাদের মতাদর্শিক নৈকট্যের ওপর। ইউরোপীয়দের জন্য পরামর্শ হলো, রুবিওর মধুর আহ্বানে বিভ্রান্ত না হয়ে কলবির 'শক থেরাপি'-কেই কার্যকর হতে দেওয়া বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। মার্ক লিওনার্ড, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক, এই বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
