ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা পরমাণু আলোচনা: জেনেভায় উত্তেজনা প্রশমন ও যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয় দফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে পৌঁছেছেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমন এবং সম্ভাব্য নতুন কোনো সামরিক সংঘাত সম্পূর্ণভাবে এড়ানো। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন যে বর্তমান চলমান উত্তেজনা খুব সহজেই একটি বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
আরাগচির বাস্তবধর্মী প্রস্তাব ও অটল অবস্থান
আব্বাস আরাগচি সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি একটি 'ন্যায্য ও সমতাপূর্ণ' চুক্তির জন্য কিছু বাস্তবধর্মী ও কার্যকরী প্রস্তাব নিয়ে জেনেভায় এসেছেন। তবে তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের মুখে ইরান কখনোই নতি স্বীকার করবে না। মঙ্গলবার মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই আরাগচি সোমবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সাথে একটি গভীর ও ব্যাপক কারিগরি আলোচনায় মিলিত হচ্ছেন।
পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শন ও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইরানের প্রধান প্রধান পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এই স্থাপনাগুলো গত জুন মাসের যুদ্ধের সময় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তেহরান সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কারণে উল্লেখযোগ্য তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি বিদ্যমান থাকতে পারে। তাই নিরাপদ ও কার্যকর পরিদর্শনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত প্রোটোকল অত্যন্ত জরুরি। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি
এই কূটনৈতিক তৎপরতার সম্পূর্ণ বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ কঠোর ও দৃঢ়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আলোচনার ফলাফল ইতিবাচক না হলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত 'বেদনাদায়ক' পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় একটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের মূল দাবি হলো ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পরমাণু অধিকারকে একটি 'রেড লাইন' বা অলঙ্ঘনীয় সীমা হিসেবে ঘোষণা করেছে যা নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল ও আলোচনার পরিধি
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জেনেভার এই আলোচনায় কেবল ইরান সংকটই নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ অবসানের বিষয়েও মঙ্গলবার একটি পৃথক কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, কিয়েভকে বারবার ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে যা তারা কখনোই মেনে নেবে না।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বৈশ্বিক প্রভাব
তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়টিও এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই বৈঠকটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই আলোচনার ফলাফল পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
