বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত—এই তিন দেশই বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে পিছিয়ে রয়েছে। ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেছেন, সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাষ্ট্রীয় চাপ ও বাজারের চাপের সমন্বয়। তবে ভয় তুলনামূলক কম কাজ করে। তিনি বলেন, 'অনেক সংবাদমাধ্যমের জন্য বাজারের চাপ বড়, আবার অনেকের জন্য সরকারই প্রধান চাপ।'
সরকারের ইতিবাচক সংবাদের চাপ
জাফর আব্বাসের মতে, ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—প্রতিটি দেশের সরকারই নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে তথাকথিত ইতিবাচক সংবাদ চায়। তারা চায় সংবাদমাধ্যম তাদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা এড়িয়ে যাক। কোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সরকার সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম, সম্পাদক বা প্রতিবেদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে অনেকেই ভীত হয়ে পড়েন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা 'সেলফ সেন্সরশিপ' শুরু হয়। এ কারণে মূলধারার ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, যা স্বাধীনতা সূচকের অবনতির একটি কারণ।
পাকিস্তানে সাংবাদিকতার চাপ
পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে জাফর আব্বাস বলেন, তিনি সহজে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন না। তবে অনেক সংবাদমাধ্যম সরকারি চাপে হার মেনেছে এবং সরকারের চাওয়া অনুযায়ী সাংবাদিকতা করছে। একসময় সরকারি মহল থেকে ফোন আসত, কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ বা নির্দেশ দেওয়া হতো। এখন তিনি এসব ফোন ধরেন না। কিন্তু তিনি জানেন, অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখা হয়। কেউ কেউ সরকারি অবস্থান অনুসরণ করায় পুরস্কৃতও হয়। তিনি মনে করেন, সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে সরকারগুলো চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করানোর চেষ্টা চালিয়েই যাবে।
অদৃশ্য রেডলাইন
অদৃশ্য রেডলাইন প্রসঙ্গে জাফর আব্বাস বলেন, 'অদৃশ্য রেডলাইন সব সময়ই থাকে। যেহেতু সেগুলো অদৃশ্য, তাই আমরা সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি না।' সাংবাদিকতা সম্পর্কে বাস্তববাদী হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে সংবাদমাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি অবস্থানের কাছাকাছি চলে যায়, কারণ সরকারি সূত্র ছাড়া তথ্য পাওয়ার বিকল্প কম থাকে। সম্পাদকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন রেডলাইন উপেক্ষা করা প্রয়োজন আর কোনটি জাতীয় স্বার্থে মেনে চলা উচিত।
প্রিন্ট থেকে ডিজিটালে রূপান্তর
পাকিস্তানে প্রিন্ট থেকে ডিজিটালে রূপান্তর প্রসঙ্গে জাফর আব্বাস বলেন, ধীরে ধীরে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কমবে, আর ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বাড়বে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, যেসব সংবাদপত্রে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের শক্তিশালী দল আছে—যেমন ডনে আছে—তারা বহু বছর প্রাসঙ্গিক থাকবে। তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ তৈরির দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও নিউজপ্রিন্টের দাম
বিজ্ঞাপন আয়ের বড় অংশ এখন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে। জাফর আব্বাস বলেন, নতুন বাস্তবতায় সংবাদপত্রগুলো রাজস্ব হারাচ্ছে। তবে সংবাদপত্র খুব দ্রুত হারিয়ে যাবে—এটা তিনি মনে করেন না। রাজস্ব কমে যাওয়ায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। পাকিস্তানে নিউজপ্রিন্ট আমদানি করতে হয়, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ডনের দামও বাড়ে। তিনি সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক দিক দেখেন না, শুধু সম্পাদকীয় বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
পাঠকসংখ্যা ও ডিজিটাল সম্প্রসারণ
পাঠকসংখ্যা কমছে বলে ধারণা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন জাফর আব্বাস। তিনি বলেন, পাঠক কাগজের সংস্করণ থেকে ডিজিটাল সংস্করণে চলে যাচ্ছেন। ডনের মুদ্রিত সংস্করণের প্রচারসংখ্যা সীমিত হলেও এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশাল। প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি পেজ ভিউ হয়। চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে এমন আর্থিক মডেল তৈরি করা যায়, যা ওয়েবসাইটকে লাভজনক করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
ডনের নিউজরুমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার প্রসঙ্গে জাফর আব্বাস বলেন, বর্তমানে তারা কপি সম্পাদনার কাজে এআই ব্যবহার নিরুৎসাহিত করেন। মূলত তথ্য যাচাই ও সংগ্রহে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে সংবাদ লেখা বা বিশ্লেষণে নয়। কোনো প্রতিবেদক এআই ব্যবহার করলে তাঁকে ডেস্ককে জানাতে হয়। তিনি মনে করেন, সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম এআই থেকে ইতিবাচকভাবে উপকৃত হবে। ডনের একটি দল নিয়মিত এআই ও এর ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে।
পাকিস্তানে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ
পাকিস্তানে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে জাফর আব্বাস আশাবাদী। তিনি বলেন, একসময় দেশে হাতে গোনা কয়েকটি সংবাদপত্র ছিল। এখন ২৪ ঘণ্টার ৪০টির বেশি টেলিভিশন চ্যানেল আছে, অসংখ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে। বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, স্বৈরাচারী বেসামরিক সরকার—সবই ছিল। কখনো সংবাদমাধ্যম তুলনামূলক স্বাধীন ছিল, কখনো ছিল কঠোর সেন্সরশিপ। কিন্তু সাংবাদিকেরা প্রতিবারই সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, 'সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তাহলে কোনো সরকারের পক্ষেই দীর্ঘদিন এসব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি আশা করি, পাকিস্তানেও সেটি দ্রুত ঘটবে।'



