যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর গ্রামে প্রেমের সূত্র ধরে বিয়ে করে ইকরামুল কবির (২৬) নামে এক যুবককে হত্যার পর লাশ গুমের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। শনিবার বিকালে অভিযুক্তদের বাড়ির গোয়ালঘরের মেঝে খুঁড়ে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক দম্পতিকে আটক করা হয়েছে।
নিহতের পরিচয় ও ঘটনার সূত্রপাত
নিহত ইকরামুল কবির উপজেলার পুটখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ বারোপোতা গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে। পুলিশ, নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বসতপুর পূর্বপাড়া এলাকার আল ফুয়াদের স্ত্রী মুন্নী আক্তারের (২২) সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইকরামুল কবিরের প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। গত ৮ এপ্রিল ইকরামুল মুন্নীর কাছে পাওনা টাকা আনতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এরপর থেকেই তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
মামলা ও অভিযোগ
এ নিয়ে গত মঙ্গলবার যশোরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শার্শা আমলি আদালতে মামলা করেন ইকরামুলের বাবা আব্দুর রশিদ। মামলায় পাঁচ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, তার একমাত্র ছেলে ইকরামুল কবিরকে দীর্ঘদিন ধরে মুন্নী প্রেমের প্রস্তাব ও বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে আসছিলেন। ইকরামুলকে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে চেষ্টা করেন। এতে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাকে ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করেন। মুন্নী অতীতেও একাধিক যুবককে একইভাবে বিয়ে করে তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পরে ডিভোর্স দেন। বিয়ের এক মাসের মধ্যেই ইকরামুলের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। একইসঙ্গে ইকরামুল ও তার পরিবারের কাছে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়।
নিখোঁজ ও মুক্তিপণ দাবি
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল ইকরামুল নিজ গ্রাম থেকে বড় বোনের বাড়ি শার্শা থানার সেতাই গ্রামে বেড়াতে যান। রাত ১টার দিকে মুন্নী তাকে ডেকে নিয়ে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। একইসঙ্গে হুমকি দেওয়া হয়, টাকা না দিলে ইকরামুলকে জীবিত পাওয়া যাবে না। এরপর থেকেই ইকরামুলের ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করা হয়। বাদী অভিযোগ করেন, ছেলের খোঁজ জানতে চাইলে মুন্নী বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ইকরামুলকে জীবিত ফেরত পেতে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন।
পুলিশের তদন্ত ও লাশ উদ্ধার
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধলে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে মুন্নীর স্বামী আল ফুরাদকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার বিকালে বসতপুর গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে গোয়ালঘরের মেঝে খুঁড়ে ইকরামুলের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত আল ফুরাদ ও তার স্ত্রী মুন্নীকে আটক করে পুলিশ।
হত্যার কারণ ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সূত্র ধরে মুন্নীকে টাকা ধার দেন ইকরামুল। ওই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাকে শ্বাসরোধে কিংবা অন্য কোনও উপায়ে হত্যা করে লাশ গুম করে দেওয়া হয়েছিল। গোয়ালঘরের মেঝে খুঁড়ে সেই লাশ উদ্ধার করা হয়। এদিকে, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শত শত লোক অভিযুক্তদের বাড়ির সামনে ভিড় জমান। দীর্ঘ এক মাস পর মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় লোকজন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন বলেন, ‘লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



