বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতা: ১৫২তম স্থানে পতন ও মব-ভীতির সংস্কৃতি
বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতা: ১৫২তম স্থানে পতন ও মব-ভীতির সংস্কৃতি

আজ মে মাসের তিন তারিখ, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। দুদিন আগে, মে মাসের প্রথম দিনে, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকের তালিকা। সে তালিকায় বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৫২তম। সন্দেহ নেই আমাদের এই অবস্থান সম্মানজনক নয়। সংস্থাটি প্রতিবছরই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে এরকম প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে স্বাধীনতার সূচকে কোন দেশের কী অবস্থান সেটাও থাকে। গত ২৫ বছর ধরে এটা চলছে। এবং প্রতিবছরই আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক নিচে থেকে আরও নিচের দিকে নামে। গতবারের তুলনায় এবার আমাদের পতন হয়েছে তিন ধাপ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পতনের কারণ

এবারের সূচকটা নির্ধারিত হয়েছে পুরো ২০২৫ সালের পরিস্থিতির বিবেচনায়, যখন দেশে ছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ড. ইউনূস সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গণমাধ্যমগুলোর উদ্দেশে বলেছিলেন, প্রাণখুলে সমালোচনা করতে। যে সময়ে সরকার প্রধান প্রাণখুলে সমালোচনা করতে বলেন, সেই সময়ে তাহলে স্বাধীনতা সূচকে আমাদের এমন বিস্ময়কর পতন কী করে হয়? এর জবাব পেতে হলে তাকাতে হবে সেই সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের দিকে। বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীর জীবন কি এই সময়ে 'মব' নামক আতঙ্কের মধ্যে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল না? গণমাধ্যমকর্মীদের জীবনকে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় ঠেলে দিয়ে মুক্ত গণমাধ্যম কি আদৌ সম্ভব?

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে মব-ভীতির চিত্র

এক্ষেত্রে বরং আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলি। 'অন্য মঞ্চ' নামে আমার একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। সেখানে প্রতিদিনই কোনও একজন ব্যক্তির সঙ্গে আমার আলাপচারিতা প্রচার হয়। কিছুদিন আগে এক সাবেক সহকর্মীকে আমার অনুষ্ঠানে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি বিনয়ের সঙ্গে সেটি ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ''ভাই আপনি তো সবই জানেন। এ সময়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা কি ঠিক হবে? আর কটা দিন যাক, পরিস্থিতি আর একটু স্বাভাবিক হোক, তখন বলবো!''

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমার এই সহকর্মী কি আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কোনো কর্মী ছিলেন? কিংবা হাসিনা সরকারের কোনও দালাল? হাসিনা শাসনের দেড় দশক দালালি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গিয়েছিলেন? এই প্রতিটি প্রশ্নের জবাব হবে—'না'।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই গণহারে মামলা হয়েছে। এর সিংহভাগই হত্যা মামলা। সেসব মামলার অনেকগুলোর এখনও তদন্তই শুরু হয়নি। অথচ প্রায় দুবছর ধরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক কারাগারে। তারা জামিনও পাচ্ছেন না।

যে সহকর্মীর কথা বলছি, তার বিরুদ্ধে সেরকম কোনও মামলাও হয়নি। তারপরও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। আমি বললাম, আপনাকে সেরকম বিব্রতকর রাজনৈতিক কোনও প্রশ্ন করবো না, আওয়ামী লীগ বা হাসিনা সম্পর্কেও কিছু জিজ্ঞাসা করবো না, এমনকি বর্তমান সরকার বা বিরোধী দল নিয়েও কিছু জানতে চাইবো না। কেবল সামাজিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবো। তিনি তবুও রাজি হলেন না। ওই একই কথা বললেন— ''আরও কটা দিন যাক!''

আমার এই সাবেক সহকর্মী কিন্তু একটি মিডিয়াতে এখনও কাজ করছেন। চাকরি করছেন, কিন্তু আলোচনায় আসতে চাইছেন না। এই যে আলোচনায় না আসতে চাওয়া, এর পেছনে কাজ করছে মব-ভীতির সংস্কৃতি। সন্দেহ নেই চব্বিশের আগস্টের পর থেকে দেশে একটি মবের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। চট করেই অপছন্দের ব্যক্তির গায়ে একটি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া যেত। তারপর তার ওপর লেলিয়ে দেওয়া হতো মব। তখন তার চাকরি নিয়েই টানাটানি পড়ে যেত।

মব-সংস্কৃতির শিকার সাংবাদিকরা

অনেকের কিন্তু এভাবে গেছেও চাকরি। প্যারিস বা নিউ ইয়র্ক থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এসব মবকে উসকে দেওয়া হতো। অন্তর্বর্তী সরকার সেই মবকে দিতো প্রশ্রয়। একাধিক ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাবে। কারওয়ান বাজারের একটি টেলিভিশনের কথা বলতে পারি। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদের একজনের চাকরি খেয়ে দেওয়া হলো নিউ ইয়র্ক থেকে আসা এক মবকারীর ফোনের কারণে। হুমকি এলো—অমুককে বাদ না দিলে আপনার টিভিকেই চলতে দেওয়া হবে না! এরকম ঘটনা অনেক মিডিয়াতেই ঘটেছে। এক ফোনে, এক ধমকে মালিকপক্ষ অনেককেই চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আপনি হয়তো বলবেন, মালিকপক্ষই বা কেন এতটা মেরুদণ্ডহীন হবে? কিন্তু চব্বিশ-পঁচিশের বাস্তবতা ভিন্ন রকম ছিল। এসব মবকে খোদ ইউনূস সরকারই মদদ দিয়েছে। সরকারের প্রশ্রয়ে এই দুর্বৃত্তপনা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে, কেবল মেরুদণ্ড দিয়ে সেটাকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না।

যা হয়েছে এই দেড় বছরে, সে তুলনায় আমার ওই সহকর্মীকে ভাগ্যবানই বলতে হয়। কারণ তিনি তবুও চাকরিটা করে যেতে পেরেছেন। অথচ আমি এমন বেশ কয়েকজন পেশাদার সাংবাদিকের নাম বলতে পারবো, যারা একসময় খুবই খ্যাতিমান ছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে যেমন ছিলেন, তেমনই আওয়ামী লীগের আগের আমলেও পেশায় গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু চব্বিশের পর ওই মবকারীরা হঠাৎ করেই তাদের বিরুদ্ধে হুজুগ তুললো। 'ফ্যাসিবাদের দোসর'—এই ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে একেবার ঘরে বসিয়ে দিলো। এদের কারও কারও নাম ওই গণহারে করা 'হত্যা' বা 'হত্যা প্রচেষ্টা' মামলাগুলোর শতাধিক আসামির মধ্যে হয়তো আছে। কারও কারও নামে আবার কোনও মামলাও নেই। এদের প্রায় সবাই কোনও না কোনও মিডিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতেন। দলীয় পরিচয়ে নয়, বরং যোগ্যতার কারণেই তারা ছিলেন ওই পদগুলোতে। 'দোসর' ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন বেকার, ঘর থেকেও বের হতে পারছেন না। কী এক দুঃসহ অবস্থা!

আবার যারা জেলে আছেন, তারাও জামিন পাচ্ছেন না। যে অভিযোগে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার কোনও তদন্তই হচ্ছে না। আমি একথা মানতে রাজি আছি—তাদের কেউ কেউ হয়তো শেখ হাসিনা সরকারের খুবই অনুগত ছিলেন। আরও রূঢ়ভাবে বললে—স্বৈরাচারী ওই সরকারের চামচা বা দালাল ছিলেন, ওই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে নানা রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বিনিময়ে সম্পদ বা অর্থকড়িও কামিয়েছেন। এ সবই মন্দ কাজ। মন্দ কাজের বিচার হোক। যে অন্যায় তারা করেছেন, সেই অন্যায়েরই বিচার হওয়া উচিত। তা না করে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব হত্যা মামলার পাইকারি আসামি, সেসব মামলায় ওই সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া কেন? প্রমাণ কি করা সম্ভব হবে, ওই সব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নের কোনও এক পর্যায়েও এই সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্টতা ছিল? এই অভিযোগগুলো থেকে যখন তারা বের হয়ে যাবেন, তখন কিন্তু কৃত অপরাধগুলোও ধামাচাপা পড়ে যাবে। আসলে সরকারের মূল লক্ষ্যটিই যদি হয় হয়রানি করা, তখন বিচারটি হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা তো বিচার চাই। অপরাধ করে থাকলে সাজা হোক, অপরাধ প্রমাণ না হলে ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া হোক। কিন্তু অযৌক্তিকভাবে ঝুলিয়ে রাখা কেন? এই যে অমীমাংসিত ভাবে ঝুলিয়ে রাখা, এটা একজন সাংবাদিকের জন্য, তার পরিবারের জন্য কতটা দুর্বিসহ হতে পারে তা অনুমান করা সহজ নয়।

সাংবাদিক ইউনিয়নের বিভেদ ও রাজনৈতিক প্রভাব

দেশে সাংবাদিকদের দুটি ইউনিয়ন আছে, একটি বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিকদের আর একটি আওয়ামী ও বামপন্থিদের। সাংবাদিকদের মধ্যে দলীয় বিবেচনায় এই যে বিভেদ, এটা সম্ভব হয়েছে 'সাংবাদিক নেতা' নামধারী কতিপয় ব্যক্তির জন্য। এরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে পুরো পেশাটিকেই দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক ইউনিয়নের ক্ষমতাও পাল্টে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের দেড় দশকে যে ইউনিয়ন বাঘের মতো বিচরণ করতো, তারা এখন বিড়ালের মতো মিউ মিউ করছে। নেতারা রীতিমত ইদুর হয়ে গর্তে লুকিয়েছে। আগের ১৫ বছরের বিড়ালরা এখন বাঘ হয়ে গর্জন করছে। একটি বিষয় খুবই ইন্টারেস্টিং, আওয়ামীপন্থি সাংবাদিক নেতাদের কেউই কিন্তু গ্রেফতার হননি। গ্রেফতার বা হয়রানির শিকার যারা হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই পেশাদার সাংবাদিক। তারা কোথাও না কোথাও চাকরি করতেন।

সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সূচকের গ্রহণযোগ্যতা

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সূচক তালিকার বিষয়ে আর একটি মন্তব্য করে লেখাটি শেষ করব। এই তালিকা যতবার প্রকাশিত হয়েছে, আমাদের দেশের সেই সময়ের সরকার কিন্তু একে মেনে নেয়নি। প্রতিবার তারা দাবি করেছে—এই তালিকা সঠিক নয়, পক্ষপাতদুষ্ট। হাসিনা সরকারের এক সময়ের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তো একবার এই তালিকা দেখে বলেছিলেন—এই তালিকা গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় নাকি আমাদের গণমাধ্যম বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে!

অন্তর্বর্তী সরকার চলে গেছে, কিন্তু তাদের কোনও উপদেষ্টাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন এই সূচক নিয়ে, দেখবেন—তারাও এর যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন। আর যদি ড. ইউনূসের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমকে পেয়ে যান, তিনি পুরো ৪২ মিনিটের একটি জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণমূলক ভাষণ দিয়ে দেবেন, প্রমাণ করে দেবেন ২০২৫ এর পুরো সময়টা বাংলাদেশের গণমাধ্যম একটি স্বর্গীয় স্বাধীনতা ভোগ করেছে! সেই সঙ্গে এটাও হয়তো বলবেন, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এই সময়ে খুবই পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে!

লেখক: সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব