সংসদে জামায়াত-সমর্থিত চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্য নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি দাবি করেন, জামায়াত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল। তার মতে, জামায়াত তখন গণতান্ত্রিক অ্যাকশন কমিটিতে (ডিএসি) প্রতিনিধিত্ব করত, যা শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য কাজ করত। কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন গোলাম আজম, আর জোটের অন্য একটি সংগঠনের যুগ্ম-সেক্রেটারি ছিলেন প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ।
বক্তব্যের প্রেক্ষাপট
মঙ্গলবার ১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াত কি সত্যিই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল? যদি করে থাকে, তাহলে এতদিন তা গোপন রাখা হলো কেন?
বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
তবে বেশ কয়েকজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক এই দাবিকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা থেকে মনোযোগ সরাতে এমন দাবি আনা হচ্ছে। সাবেক ডাকসু ভিপি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এই দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তিনি জানান, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের মূল দাবি ছিল পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পদত্যাগ। এর মধ্যে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তিও ছিল, তবে আন্দোলন শুধু একটি দাবির ওপর ভিত্তি করে সংগঠিত হয়নি।
ঐতিহাসিক প্রমাণ
রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি বাড়তে থাকে। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা ভিত্তিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যাতে আওয়ামী লীগ (ছয় দফা গ্রুপ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী খান গ্রুপ) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ আটটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা অন্তর্ভুক্তি, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি, ভোটাধিকার ও সংসদীয় গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি।
আন্দোলনের তীব্রতায় আইয়ুব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের অক্টোবর থেকে ক্ষমতায় ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পদত্যাগ করেন।
বক্তব্যের সত্যতা
শাহজাহান চৌধুরীর দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে তৎকালীন ডিএসিতে আটটি দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে পাকিস্তান জামায়াতের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত আমির মিয়া মুহাম্মদ তোফায়েলের নাম পাওয়া যায়, কিন্তু গোলাম আজমের নাম নেই। প্রবীণ রাজনীতিবিদরাও এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন যে কমিটি শুধু শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য কাজ করেছিল। তাদের মতে, আন্দোলন ছিল আইয়ুব খানের পতনের লক্ষ্যে ১১ দফা আন্দোলনের অংশ, যেখানে আগরতলা মামলার আসামিরা একটি উপাদান মাত্র।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, তিনি প্রথমবারের মতো শুনলেন যে জামায়াত বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল। তিনি এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিচ্ছেন না, তবে এতদিন পর কেন এমন ইস্যু তোলা হচ্ছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। তার মতে, ১৯৭১ সালের অপরাধ ঢাকতে আরও এমন দাবি আসতে পারে, তবে তা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে সফল হবে না। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও বলেন, তিনি এ ধরনের দাবি সম্পর্কে অবগত নন এবং প্রথমবার শুনছেন।



