পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় সাত জেলার ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ ঘিরে সকাল থেকেই ছিল প্রবল উৎসাহ ও উত্তেজনা। বুধবার দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভোটদানের হার যেমন বেড়েছে, তেমনই পালটাপালটি রাজনৈতিক অভিযোগের মাত্রাও বেড়েছে।
ভোটের হার রেকর্ডের পথে
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৯০.৩৪ শতাংশ, যা কার্যত রেকর্ড ছোঁয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসআইআর-পরবর্তী হিসাবে এই ১৪২টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৫ হাজার ২৯৯।
সকাল ৯টা থেকেই ভোটদানের গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথম দুই ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ১৮.৩৯ শতাংশ। সেই সময় সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে মন্তেশ্বর ও গলসিতে, আর সবচেয়ে কম মহেশতলায়। যদিও প্রথম দফার তুলনায় সামান্য পিছিয়ে ছিল এই হার; কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় তা অনেকটাই এগিয়ে ছিল।
বেলা ১১টায় ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯.৯৭ শতাংশ। পূর্ব বর্ধমান তখনই শীর্ষে উঠে আসে ৪৪.৫০ শতাংশ ভোট নিয়ে। কলকাতা দক্ষিণে তুলনামূলক কম ভোট পড়ে। গলসি ও মন্তেশ্বর আসনভিত্তিক তালিকায় এগিয়ে ছিল, আর মহেশতলা ছিল পিছিয়ে। ভবানীপুরেও তখন ভোটের হার মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিল।
দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোটদানের হার আরও বাড়ে এবং একাধিক কেন্দ্রে তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। গলসি তখনই ৭০ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। ভবানীপুর, ভাঙড় ও মহেশতলায়ও ভোটের হার ক্রমেই বাড়তে থাকে। এ সময়ের ভোটদানের হার ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিল, যা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
বেলা ৩টা পর্যন্ত ভোটদানের হার দাঁড়ায় ৭৮.৬৮ শতাংশ, যা প্রথম দফার প্রায় সমান। পূর্ব বর্ধমান এ সময়েও শীর্ষে ছিল এবং কলকাতা দক্ষিণ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। আসনভিত্তিক হিসাবে গলসি সর্বোচ্চ ৮৫.১১ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং মহেশতলায় ছিল সবচেয়ে কম। ভবানীপুরেও ভোটের হার ৭৫ শতাংশ পেরিয়ে গেছে।
দিনের শেষে ভোটদানের গতি আরও বাড়ে এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তা ৯০.৩৪ শতাংশে পৌঁছে যায়। এ হার শুধু দ্বিতীয় দফাকেই নয়, সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের অন্যতম উচ্চতম অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত হিসাবে সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অভিযোগ
ভোটের উচ্চহার যেমন নজর কেড়েছে, তেমনই দিনভর রাজনৈতিক উত্তাপও ছিল তীব্র। ভবানীপুরে ভোট দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আগের রাত থেকে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে এবং নারীদের হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে। আরামবাগ, খানাকুল ও গোঘাটের মতো এলাকায়ও একই অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি।
একই সঙ্গে তিনি নিজের জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তার দলই ক্ষমতায় ফিরবে। দিনের শুরুতে তিনি ভবানীপুরের একাধিক বুথ পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন।
অন্যদিকে বিরোধী শিবির থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভবানীপুরে উত্তেজনার আবহে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের উপস্থিতি ঘিরে স্লোগান যুদ্ধ শুরু হয়। সেই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, এ ঘটনাবলির ফলে তার ভোট আরও বাড়বে। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, উত্তেজনা তৈরিতে উসকানি দেওয়া হয়েছে এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে।
ভোট চলাকালীন দিনের বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও লাঠিচার্জে কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ভোট প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল এবং অধিকাংশ জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।



