ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতের অবসান কেন হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সমীকরণের দিকে ইঙ্গিত করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ইরান নীতি গড়ে তুলেছেন মূলত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসা বা শিথিল করার অনীহাই আলোচনার টেবিলে অচলাবস্থার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক লড়াই
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এখন আর বড় কোনও ইস্যু নয়; বরং মূল লড়াইটি হচ্ছে অর্থের। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘অর্থ বা টাকাই হচ্ছে এই সমস্যার বড় একটি অংশ। ইরানের দিক থেকে যেকোনও সমঝোতার চাবিকাঠি হলো এই অর্থ।’
ট্রাম্পের ইরান নীতির ভিত্তিই হলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তবে তার এই অবস্থানের কারণে তিনি নিজেই একটি রাজনৈতিক ফাঁদে পড়েছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে থেকেই ট্রাম্প ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) সমালোচনা করে আসছিলেন এবং তৎকালীন ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরানের জন্য ‘বিমানের মাধ্যমে নগদ টাকা’ পাঠানোর অভিযোগ তুলেছিলেন।
এখন পরিস্থিতি এমন যে, ওবামার সেই চুক্তির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি যে ভাষায় কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যেকোনও নতুন সমঝোতা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ভাটানকা বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেই নিজের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছেন। জেসিপিওএ নিয়ে তিনি যেভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছিলেন, তা এখন তার নিজের কাজের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তিনি এখন যা-ই করবেন, তা ওবামার সঙ্গে তুলনার মাপকাঠিতে বিচার করা হবে।’
পারমাণবিক ইস্যু এখন ‘বিটাম্যাক্স’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তির মার্কিন আলোচক দলের সাবেক সদস্য অ্যালান আয়ারের মতে, এখনকার প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক ইস্যু অনেকটা সেকেলে হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “পারমাণবিক ইস্যুটি এখন অনেকটা ‘বিটাম্যাক্স’-এর মতো।” উল্লেখ্য, বিটাম্যাক্স হলো ১৯৭৫ সালের ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার যা এখন আর ব্যবহৃত হয় না।
তিনি আরও বলেন, ‘সবাই এখন আলোচনা করছে ইরান কী ছাড় দিতে রাজি আছে তা নিয়ে। কিন্তু এর পুরোটাই নির্ভর করছে তারা বিনিময়ে কী পেতে যাচ্ছে তার ওপর। ইরান এখন মূলত টাকা চায়।’
ক্ষতিপূরণের চার উপায়
আয়ারের মতে, ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চারটি সম্ভাব্য উপায় আছে। এগুলো হলো- যুদ্ধাপরাধের ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির টোল, জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করা এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের মাধ্যমেই সমঝোতার পথ সবচেয়ে সহজ বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও বিমান হামলায় ইরান প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইরানের একটি বাণিজ্য বিষয়ক পত্রিকার এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির পুনর্গঠন কাজ শেষ করতে অন্তত ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
ইরান এই যুদ্ধের সময়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেল বিক্রি করে কিছুটা সুবিধা পেয়েছে। তবে মার্কিন অবরোধ সেই পথকেও সংকীর্ণ করে দিচ্ছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে নারাজ। শুক্রবার পাকিস্তানে দুই দেশের বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র একটি চীনা তেল শোধনাগার এবং ইরানের তেল পরিবহনকারী ডজনখানেক শিপিং ফার্মের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে নির্ধারিত সেই বৈঠকটি ভেস্তে যায়।
লজ্জা এড়াতে নিষেধাজ্ঞায় অটল
অনেকে মনে করেন, ইরান যদি যুদ্ধের আগের চেয়ে ভালো আর্থিক অবস্থায় ফিরে আসে, তবে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক হবে। গত মার্চে দাভোস ফোরামে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটি অর্থনৈতিক রাষ্ট্রকৌশল কোনও গুলি খরচ হয়নি। আর সবকিছু খুব ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে।’
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সির মতে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের ধারণাটি ব্যবহার করছে কেবল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি টোল থেকে পাওয়া টাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে যে অর্থ পেত ইরান, সেটির ধারেকাছেও যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানিরা এই আলোচনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছে। আর তার মানে হলো সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।’
কিন্তু এই পথটি অত্যন্ত বন্ধুর। পার্সির মতে, ‘ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বড় লড়াই হবে। ইসরায়েলিরা যেকোনও ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার তীব্র বিরোধী। তারা এটি থামাতে যা যা করার প্রয়োজন সব করবে।’
ইরানের সংশয়
ইরানের পক্ষ থেকেও রয়েছে তীব্র সংশয়। দেশটি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের একতরফা বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ভুলে যায়নি। ফলে ট্রাম্প যদি এখন কোনও নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেন, ইরান তাতে খুব সতর্ক থাকবে। আয়ার বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এটি পরিবর্তনযোগ্য। ইরান ভয় পাচ্ছে যে, নিজেদের মূল্যবান সব কিছু দিয়ে তারা এমন কিছু নেবে, যা আবার যেকোনও সময় কেড়ে নেওয়া হতে পারে।’
এছাড়া, ইরান হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায়ের যে ধারণা দিচ্ছে, তাতেও প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর (যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত) তীব্র আপত্তি রয়েছে। তারা ইরানকে এই জলপথের গেটকিপার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
ভার্জিনিয়া টেকের অর্থনীতিবিদ জাভাদ সালেহি-ইসফাহানির মতে, ‘ইরান কেবল তেল উত্তোলন ও রফতানি করার ক্ষমতাই চায় না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা করতে চায়। তাদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। যুদ্ধ শেষ হতে হবে একটি স্বাভাবিক অর্থনীতি নিয়ে।’



