স্বামী নজরুল ইসলামের ছবির দিকে তাকিয়ে নীরবে অশ্রু ফেলেন সেলিনা ইসলাম। শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ শহরের সিদ্ধিরগঞ্জে এই দৃশ্য দেখা যায়। নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের এক যুগ পূর্ণ হচ্ছে আজ সোমবার। কিন্তু এখনো বিচারের রায় কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের।
রায় কার্যকর না হওয়ার কষ্ট
খুন হওয়া সাতজনের একজন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম। প্রয়াত স্বামীর ছবির অ্যালবামের দিকে তাকালে এখনো অশ্রু ধরে রাখতে পারেন না স্ত্রী সেলিনা ইসলাম। ১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ক্ষত এখনো শুকায়নি। আলোচিত হত্যা মামলাটির বাদী সেলিনা ইসলাম গত শুক্রবার আক্ষেপ করে প্রথম আলোকে বলেন, 'বিচারের রায় হয়েছে, কিন্তু রায় কার্যকর হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় কষ্টের। শুধু নিহত ব্যক্তিদের পরিবার নয়, দেশবাসীও এই রায় কার্যকর দেখতে চান। সুপ্রিম কোর্টে এই রায় কেন ঝুলে আছে, আমরা জানি না। এক যুগ ধরে আমরা প্রচণ্ড হতাশায় ভুগছি। সরকার চাইলেই খুনিদের বিচারের রায় কার্যকর হবে।'
ঘটনার বিবরণ
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনা থেকে ছয়জন এবং পরদিন পাওয়া যায় আরও একজনের মরদেহ। নিহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলামের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, লিটন, তাজুল ইসলাম ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম।
মামলার বিচার ও রায়
আলোচিত এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিমকে হত্যার ঘটনায় চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় আরেকটি মামলা করেন। পুলিশ মামলা দুটি একসঙ্গে তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
আলোচিত ওই মামলার বিচারে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত র্যাব-১১–এর সাবেক তিন কর্মকর্তা (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এম এম রানা, সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে আসামিপক্ষের আপিলে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রাখেন আদালত।
বর্তমান অবস্থা
সাত খুন মামলার সর্বশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) পর্যায়ে রয়েছে।
স্বজনদের দুর্দশা
পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশাহারা মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিম হোসেনের পরিবারসহ বেশ কয়েকটি পরিবার। অর্থসংকটে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। জাহাঙ্গীর মারা যাওয়ার সময় দুই মাস ১০ দিন পর তাঁর স্ত্রী সামসুন নাহার নূপুর মেয়ে রওজার জন্ম দেন। জাহাঙ্গীরের মেয়ের বর্তমান বয়স প্রায় ১২ বছর। সে একটি মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সামসুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক হয়েও নূর হোসেনের টাকার কারণে যেভাবে সাতটি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের বিচারের রায় কার্যকরে কেন এক যুগ সময় লাগবে? দ্রুত রায় কার্যকরের উদ্যোগ এবং নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি। মেয়েটি জন্মের পর তার বাবাকে দেখেনি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'আমাদের সাতটি পরিবারকে ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবারের কর্তাব্যক্তিকে হারিয়ে সবাইকে অর্থসংকটে জীবন যাপন করতে হচ্ছে।'
আইনজীবী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য
আলোচিত এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সাত খুনের ঘটনার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের মানুষের আবেগ জড়িত। আসামিপক্ষ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিশেষ ব্যক্তি হওয়ায় শুনানি দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। দ্রুত এই মামলার নিষ্পত্তি হবে, এটা নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও দেশের মানুষেরও প্রত্যাশা।
যোগাযোগ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, 'চূড়ান্ত বিবেচনায় ভুক্তভোগীরা যেমন বিচার পাবেন, তেমনি আসামিরাও ন্যায়বিচার পাবেন—এটা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা যত দ্রুত সম্ভব, এই মামলার শুনানি সম্পন্ন করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করব।'



