যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারের পাকিস্তান সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে আলোচনার লক্ষ্য নিয়ে তাদের এই সফর বাতিলের ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। একদিকে হোয়াইট হাউস চাইছে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে। অন্যদিকে আলোচনার টেবিল থেকে বেরিয়ে আসার ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন সমাধানের জন্য খুবই অল্প বিকল্প ও জটিল পথ খোলা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও ইরানের পাল্টা প্রস্তাব
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শনিবার জানিয়েছেন, ইরানের কাছ থেকে আসা প্রস্তাবটি হোয়াইট হাউসের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি সফরটি বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, “যদি এমন কোনও দলিল দেওয়া হয় যা যথেষ্ট ভালো নয়, তাহলে আমরা প্রতিবার ১৫ ঘণ্টা বিমানে বসে আসা-যাওয়া করব না।” তবে নাটকীয় মোড় আসে সফর বাতিলের ঠিক ১০ মিনিট পর। ট্রাম্প জানান, ওই সময়ের মধ্যেই ইরান অনেক ভালো একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবুও সফরটি আর হয়নি।
ইরানের অবস্থান ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
উইটকফ ও কুশনারের ইসলামবাদে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের কথা ছিল। কিন্তু মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি; এই তিন ইস্যুতে দুই পক্ষ এখনও সমঝোতা থেকে অনেক দূরে রয়েছে। আব্বাস আরাঘচি ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের আসলেই কূটনীতি এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনও সদিচ্ছা আছে কি না, তা দেখার বিষয়।”
শনিবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি ওমান ও রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর যদি আরাঘচি মনে করেন যে চুক্তির সুযোগ আছে, তবে আগামী দিনগুলোতে উভয় পক্ষ আবারও বসতে পারে। আলোচনার এই অচলাবস্থা ট্রাম্পের জন্য তিনটি অস্বস্তিকর পথ তৈরি করেছে। তিনি চাইলে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন, অথবা এমন কোনও চুক্তিতে রাজি হতে পারেন যা তিনি করতে চাননি। কিংবা ইরানকে চাপে রাখতে অবরোধ চালিয়ে যেতে পারেন।
ট্রাম্পের কৌশল ও ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন
অবশ্য ট্রাম্পকে পুনরায় লড়াই শুরু করতে অনাগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, তিনি চেয়েছিলেন চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই সংঘাত শেষ করতে। তবে বর্তমানে ট্রাম্পের অবরোধ বজায় রাখার কৌশল এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। ট্রাম্প সফর বাতিলের জন্য ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে দায়ী করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, “তাদের ‘নেতৃত্বের’ মধ্যে প্রচণ্ড কোন্দল ও বিভ্রান্তি রয়েছে। তাদের নিজেদেরই জানা নেই কার হাতে ক্ষমতা।”
তবে ইরানের কট্টরপন্থিরা পশ্চিমাদের সঙ্গে কোনও সমঝোতার বিরোধী। তাদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা যায় না, কারণ আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুবার ইরানে হামলা চালিয়েছে। লন্ডনের থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, “ইরানিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চায় না যতক্ষণ না তাদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আসে। তারা এই বৈঠকের কোনও অর্থ দেখছে না, কারণ এটি ট্রাম্পকে এই বয়ান তৈরির নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেবে যে ইরান আলোচনার জন্য মরিয়া।”
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূল বিরোধ
দুই পক্ষের আলোচনার মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশের বাইরে সরিয়ে নিক এবং অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করুক। যুক্তরাষ্ট্র এই সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, তারা পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশ এবং সম্ভাব্য আরও পাঁচ বছর কার্যক্রম সীমিত রাখার প্রস্তাবের প্রতি নমনীয় হতে পারে। ইরানে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতাহালি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার আমাদের রয়েছে, তা স্বীকার করলেই কেবল আলোচনার ফলপ্রসূ ফলাফল সম্ভব।”
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার জন্য চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সেখানে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল শনিবার দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, তারা রকেট লঞ্চার এবং ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এখন ওমান হয়ে মস্কো যাচ্ছেন। ওমান আরব দেশগুলোর সঙ্গে সেতু হিসেবে কাজ করছে এবং রাশিয়া ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান রাশিয়ার কাছে তাদের ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে পারে।



